চাল কুমড়া চাষের পদ্ধতি
সবজি হিসাবে আমাদের দেশে চাল কুমড়ার জনপ্রিয়তা ব্যাপক। ঘরের চালে এ সবজি ফলানো হয় বলে এটি চাল কুমড়া নামে পরিচিত। তবে চাল কুমড়া শুধু চালে নয় ইহা জমিতে মাচায় চাষ করলে ফলন বেশি হয়। সবুজ কচি চাল কুমড়া তরকারি হিসেবে খাওয়া হয়। শুধু চাল কুমড়াই নয় এর কচি পাতা ও ডগা খাওয়া যায়। আর চুনের মত সাদা চাল কুমড়া দিয়ে বড়ি, মোরব্বা ও হালুয়া তৈরি করা যায়।
পুষ্টিগুণ:
চাল কুমড়া পুষ্টিকর সবজি। চাল কুমড়াই বিভিন্ন ধরণের ভিটামিন, আমিষ, শর্করা, চর্বি ও ক্যালসিয়াম রয়েছে।
ঔষধিগুণ:
চাল কুমড়ার বড়ি ও মোরব্বা ফুসফুসের জন্য উপকারী। চাল কুমড়ার বীজ কৃমি নাশ করে থাকে। এবং এর রসের সাথে চিনি মিশিয়ে খেলে অজীর্ণ রোগ ভাল হয়।
জাত নির্বাচন:
আমাদের দেশে একটি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন হয়েছে যা বার মাসই চাষ করা যায়। নাম তার বারি চাল কুমড়া-১। সম্প্রতি আমাদের দেশে হাইব্রিড জাতের চালকুমড়ার বীজও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। এসব জাতের মধ্যে জুপিটার, ইউনিক, ভেনাস, পানডা, সুমাইয়া, বাসন্তী, নিরালা, মনি, দেব-১২০৩, মাধবী ইত্যাদি অন্যতম।
মাটি:
প্রায় সব ধরনের মাটিতে চাল কুমড়া চাষ করা যায়। তবে চাল কুমড়া চাষের জন্য দো-আঁশ ও এটেল দো-আঁশ মাটি উত্তম।
বপনের সময়:
সারা বছরই চাল কুমড়ার চাষ করা যায়। তবে ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত বীজ বোনার উপযুক্ত সময়।
বীজের পরিমাণ:
প্রতি শতাংশ জমিতে প্রায় ১৫-২০ গ্রাম বীজের দরকার হয়।
জমি তৈরি ও বীজ বপন:
চাল কুমড়া যদি বসতবাড়িতে করতে চান সেক্ষেত্রে ঘরের কোণে মাদা তৈরি করে তাতে ৩-৪টি বীজ বপন করতে হবে। এবং চারা গজালে ও একটু বড় হলে বাঁশের কঞ্চি বা পাট কাঠি চারার গোড়ায় পুঁতে দিয়ে চারাগুলো চালায় তুলে দিতে হবে। আর জমিতে চাষ করলে জমি ভাল করে ৩-৪টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হবে।
তারপর জমিতে মাদা তৈরি করে ৪-৫টি বীজ বপণ করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে জমিতে যেন বৃষ্টির বা বন্যার পানি জমে না থাকে।এরপর ২.৫ ফুট চওড়া ২ ফুট গভীর গর্ত তৈরি করতে হবে। ২ থেকে ২.৫০ মিটার দূরে দূরে মাদা তৈরি করে বীজ বুনতে হবে।
সার প্রয়োগ পদ্ধতি:
ইউরিয়া ১০-১২ কেজি
টিএসপি ৮-১০ কেজি
মিউরেট অব পটাশ ৩-৫ কেজি
জিপসাম ৩ কেজি
জিংক অক্সাইড ১০০-১৫০ গ্রাম
জৈব সার যত দেওয়া যায় তত ভাল। (শতাংশ অনুযায়ী)
ইউরিয়া সার ছাড়া অন্যান্য সব সার বীজ বোনার ৫-৭ দিন আগে জমি তৈরি করার সময় মাদার মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।
পরিচর্যার নিয়ম:
প্রত্যেক মাদায় সুস্থ সবল ২-৩ চারা রেখে বাকি চারা তুলে ফেলতে হবে। নিয়মিত বিশেষ করে গাছের গোড়ার আগাছাগুলো পরিষ্কার ও গোড়ার মাটি কুপিয়ে আলগা করে দিতে হবে। জমির মাটিতে রস না থাকলে সেচ দিতে হবে। বর্ষার পানি নিকাশের জন্য নালার ব্যবস্থা করতে হবে। গাছ বড় হওয়ার সাথে সাথে মাচা তৈরি করে দিতে হবে।
পোকমাকড় দমন:
চাল কুমড়া গাছে বিভিন্ন পোকার আক্রমন হয়। এসকল পোকার মধ্যে মাছি পোকা সবচেয়ে ক্ষতিকর। মাছি পোকার আক্রমনে চালকুমড়ার ফলন মারাত্মক ভাবে ব্যাহত হয়। এই পোকা প্রথমে চাল কুমড়ার ফুলের মধ্যে ডিম পাড়ে, পরবর্তীতে ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে ফলের ভেতর খেয়ে ফল নষ্ট করে ফেলে। এপোকার জন্য ফলন নষ্ট হয় ৫০-৬০ ভাগ।
তাই আমাদের কঠোরভাবে মাছি পোকা দমন করতে হবে। এই পোকা দমন করার প্রথম উপায় হচ্ছে-
পোকা দেখা মাত্র মেরে ফেলা।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ করা। এ পোকা মারার ফাঁদ তৈরি করা এবং বিষটোপ ব্যবহার করা।
ফসল সংগ্রহ:
চাল কুমড়া গাছ লাগানোর ৬০-৭০ দিনের মধ্যে ফল দেওয়া শুরু করে। চাল কুমড়া সবজি হিসেবে খেতে হলে সবুজ হুল যুক্ত ৪০০-৬০০ গ্রাম হলে তুলতে হবে। মোরব্বা বা বড়ি দেওয়ার জন্য পরিপক্ক করে ১২০-১৩০ দিন পর তুলতে হবে।
আমাদের দেশে চাল কুমড়ার চাষ করে অনেকেই দারিদ্র দূর করেছে।
Tuesday, April 18, 2017
ধানের ব্লাস্ট রোগ লক্ষণ এবং করণীয়
By:
এক ঘরে সব কিছু
On: 12:22 AM
ধানের ব্লাস্ট রোগ
লক্ষণ: পাতা, কান্ড ও শীষ আক্রান্ত হয়। প্রথমে পাতায় ডিম্বাকৃতির দাগ পড়ে যার দু প্রান্ত লম্বা হয়ে চোখাকৃতি ধারণ করে। দাগের মধ্যভাগ ছাই রংয়ের ও বাইরের দিকের প্রান্ত গাঢ় বাদামী হয়। অনেকগুলি দাগ একত্রিত হলে পাতাটি মরে যেতে পারে। রাতে ঠান্ডা, দিনে গরম এবং শিশির থাকলে এ রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়।
ব্যবস্থাপনা:
জমিতে সব সময় পানি ধরে রাখা।
কুশি অবস্থায় রোগটি দেখা দিলে বিঘা প্রতি ৫ কেজি পটাশ সার উপরি প্রয়োগ করে সেচ দেওয়া।
প্রতি লিটার পানিতে (টেবুকোনাজল ৫০% + ট্রাইফ্লুক্সিট্রোবিন ২৫%) জাতীয় ছত্রাকনাশক যেমন: নাটিভো ৭৫ ডব্লিউপি ০.৬০ গ্রাম মিশিয়ে বিকেলে স্প্রে করা।
অথবা প্রতি লিটার পানিতে ট্রাইসাইক্লাজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন: ট্রপার ৭৫ ডব্লিউপি বা জিল ৭৫ ডব্লিউপি ০.৮১ গ্রাম বা অন্যান্য নামের এ রোগের জন্য অনুমোদিত ছত্রাকনাশক অনুমোদিত মাত্রায় মিশিয়ে বিকেলে স্প্রে করা।
পরবর্তীতে যা যা করবেন না:
আক্রান্ত ক্ষেত থেকে বীজ সংগ্রহ করবেন না।
পরবর্তীতে যা যা করবেন:
১. ধান কাটার পর শুকিয়ে নিয়ে নাড়া জমিতেই পুড়িয়ে ফেলুন।
২. মাটি পরীক্ষা করে জমিতে সুষম সার প্রয়োগ করুন
৩. মাটিতে জৈব সার প্রয়োগ করুন
এ রোগের আশঙ্কা থাকলে জমিতে পটাশ সার দুইবারে প্রয়োগ করুন (জমি তৈরির সময় অর্ধেক ও চারা লাগানোর ৩০ দিন উইরিয়া উপরি প্রয়োগের সময় অর্ধেক)।
লক্ষণ: পাতা, কান্ড ও শীষ আক্রান্ত হয়। প্রথমে পাতায় ডিম্বাকৃতির দাগ পড়ে যার দু প্রান্ত লম্বা হয়ে চোখাকৃতি ধারণ করে। দাগের মধ্যভাগ ছাই রংয়ের ও বাইরের দিকের প্রান্ত গাঢ় বাদামী হয়। অনেকগুলি দাগ একত্রিত হলে পাতাটি মরে যেতে পারে। রাতে ঠান্ডা, দিনে গরম এবং শিশির থাকলে এ রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়।
ব্যবস্থাপনা:
জমিতে সব সময় পানি ধরে রাখা।
কুশি অবস্থায় রোগটি দেখা দিলে বিঘা প্রতি ৫ কেজি পটাশ সার উপরি প্রয়োগ করে সেচ দেওয়া।
প্রতি লিটার পানিতে (টেবুকোনাজল ৫০% + ট্রাইফ্লুক্সিট্রোবিন ২৫%) জাতীয় ছত্রাকনাশক যেমন: নাটিভো ৭৫ ডব্লিউপি ০.৬০ গ্রাম মিশিয়ে বিকেলে স্প্রে করা।
অথবা প্রতি লিটার পানিতে ট্রাইসাইক্লাজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক যেমন: ট্রপার ৭৫ ডব্লিউপি বা জিল ৭৫ ডব্লিউপি ০.৮১ গ্রাম বা অন্যান্য নামের এ রোগের জন্য অনুমোদিত ছত্রাকনাশক অনুমোদিত মাত্রায় মিশিয়ে বিকেলে স্প্রে করা।
পরবর্তীতে যা যা করবেন না:
আক্রান্ত ক্ষেত থেকে বীজ সংগ্রহ করবেন না।
পরবর্তীতে যা যা করবেন:
১. ধান কাটার পর শুকিয়ে নিয়ে নাড়া জমিতেই পুড়িয়ে ফেলুন।
২. মাটি পরীক্ষা করে জমিতে সুষম সার প্রয়োগ করুন
৩. মাটিতে জৈব সার প্রয়োগ করুন
এ রোগের আশঙ্কা থাকলে জমিতে পটাশ সার দুইবারে প্রয়োগ করুন (জমি তৈরির সময় অর্ধেক ও চারা লাগানোর ৩০ দিন উইরিয়া উপরি প্রয়োগের সময় অর্ধেক)।
Thursday, April 13, 2017
মিষ্টি কুমড়ার পাতা কোঁচকানো রোগ
By:
এক ঘরে সব কিছু
On: 5:33 AM
মিষ্টি কুমড়ার পাতা কোঁচকানো রোগ
এ রোগ হলে গাছে হলুদ ও গাঢ় সবুজ ছোপ ছোপ মোজাইক করা পাতা দেখা দেয়। পাতা কুচকে যায়।
এর প্রতিকার হল:
১. ক্ষেত থেকে আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা
২. জাপ পোকা ও সাদা মাছি এ রোগের বাহক, তাই এদের দমনের জন্য ইমিডাক্লোরোপ্রিড ১ মি.লি. / লি. হারে পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা।
এ রোগ হলে গাছে হলুদ ও গাঢ় সবুজ ছোপ ছোপ মোজাইক করা পাতা দেখা দেয়। পাতা কুচকে যায়।
এর প্রতিকার হল:
১. ক্ষেত থেকে আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলা
২. জাপ পোকা ও সাদা মাছি এ রোগের বাহক, তাই এদের দমনের জন্য ইমিডাক্লোরোপ্রিড ১ মি.লি. / লি. হারে পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা।
কুমড়ার মাছি পোকা সমাধান
By:
এক ঘরে সব কিছু
On: 5:28 AM
কুমড়ার মাছি পোকা
স্ত্রী মাছি কচি ফলের নিচের দিকে ওভিপজিটর ঢুকিয়ে ডিম পাড়ে। ডিম পাড়ার স্থান থেকে পানির মত তরল পদার্থ বেড়িয়ে আসে যা শুকিয়ে বাদামী রং ধারন করে । ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে ফলের শাস খেতে শুরু করে এবং ফল বিকৃত হয়ে যায় এবং হলুদ হয়ে পঁচে ঝড়ে যায়।
প্রতিকার :
১. আক্রান্ত ফল বা ফুল সংগ্রহ করে ধ্বংশ করা বা পুড়ে ফেলা।
২. কচি ফল কাগজ বা পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেয়া ।
৩. প্রথম ফুল আসা মাত্র কুমড়া জাতীয় ফসলের ফেরোমন ফাঁদ স্থাপন করা। প্রতি ১০ শতাংশের জন্য ৩ টি হারে ।
৪.আম বা খেজুরের রসে সামান্য বিষ মিশিয়ে তা বোতলে রেখে জানালা কেটে দিয়ে ক্ষেতের মাঝে মাঝে স্থাপন করা।
৫. পাকা মিষ্টি কুমড়া বা কুমড়া জাতীয় ফল ১০০ গ্রাম কুচি কুচি করে কেটে তাতে সামান্য বিষ ( যেমন- সপসিন ০.২৫ গ্রাম ) মিশিয়ে তা দিয়ে বিষটোপ তৈরী করে মাটির পাত্রে করে ক্ষেতের মাঝে মাঝে স্থাপন করা।
৬. সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক ১ মি.লি. / লি. হারে পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা।
বিষটোপ ও ফেরোমন ফাঁদ স্থাপন
কৃষকের আচরণগত পরিবর্তন যোগাযোগ (এফবিসিসি)
পরবর্তীতে যা যা করবেন না
১. স্প্রে করার পর ১৫ দিনের মধ্যে সেই সবজি খাবেন না বা বিক্রি করবেন না
পরবর্তীতে যা যা করবেন
১. উত্তমরুপে জমি চাষ দিয়ে পোকার পুত্তলি পাখিদের খাবার সুযোগ করে দিন।
স্ত্রী মাছি কচি ফলের নিচের দিকে ওভিপজিটর ঢুকিয়ে ডিম পাড়ে। ডিম পাড়ার স্থান থেকে পানির মত তরল পদার্থ বেড়িয়ে আসে যা শুকিয়ে বাদামী রং ধারন করে । ডিম থেকে কীড়া বের হয়ে ফলের শাস খেতে শুরু করে এবং ফল বিকৃত হয়ে যায় এবং হলুদ হয়ে পঁচে ঝড়ে যায়।
প্রতিকার :
১. আক্রান্ত ফল বা ফুল সংগ্রহ করে ধ্বংশ করা বা পুড়ে ফেলা।
২. কচি ফল কাগজ বা পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেয়া ।
৩. প্রথম ফুল আসা মাত্র কুমড়া জাতীয় ফসলের ফেরোমন ফাঁদ স্থাপন করা। প্রতি ১০ শতাংশের জন্য ৩ টি হারে ।
৪.আম বা খেজুরের রসে সামান্য বিষ মিশিয়ে তা বোতলে রেখে জানালা কেটে দিয়ে ক্ষেতের মাঝে মাঝে স্থাপন করা।
৫. পাকা মিষ্টি কুমড়া বা কুমড়া জাতীয় ফল ১০০ গ্রাম কুচি কুচি করে কেটে তাতে সামান্য বিষ ( যেমন- সপসিন ০.২৫ গ্রাম ) মিশিয়ে তা দিয়ে বিষটোপ তৈরী করে মাটির পাত্রে করে ক্ষেতের মাঝে মাঝে স্থাপন করা।
৬. সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক ১ মি.লি. / লি. হারে পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা।
বিষটোপ ও ফেরোমন ফাঁদ স্থাপন
কৃষকের আচরণগত পরিবর্তন যোগাযোগ (এফবিসিসি)
পরবর্তীতে যা যা করবেন না
১. স্প্রে করার পর ১৫ দিনের মধ্যে সেই সবজি খাবেন না বা বিক্রি করবেন না
পরবর্তীতে যা যা করবেন
১. উত্তমরুপে জমি চাষ দিয়ে পোকার পুত্তলি পাখিদের খাবার সুযোগ করে দিন।
Wednesday, April 12, 2017
জেনে নেই বৈশাখ মাসে কৃষিতে করণীয়
By:
এক ঘরে সব কিছু
On: 5:04 AM
জেনে নেই বৈশাখ মাসে কৃষিতে করণীয়
বৈশাখ বাংলা বছরের প্রথম মাস। তাই ছয় ঋতুর প্রথম ঋতু গ্রীষ্মও শুরু হয় এ মাস দিয়েই। এ মাসে থাকে সূর্যের প্রখর তাপ, অন্যদিকে দেখা যায় কালবৈশাখী ঝড়। বৈশাখের এ আবহাওয়ায় মাঠে পাওয়া যায় ধান, পাট, শাকসবজি, মসলা, ভুট্টাসহ আরো অনেক ফসল এবং বনজ ও ফলদ গাছপালা। তবে দেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে চিনিকলে মাড়াই ও গুড় করার জন্য উৎপাদিত হয় আখ ফসল। সর্বোপরি পুকুর, নদ-নদী, খাল-বিলে মাছ চাষসহ হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলের খামারিদের কাজের প্রতিও দৃষ্টি দিতে হয় এ সময়। দেশব্যাপী এ মাসে যেসব মাঠফসলের যত্ন নিতে হয় তা হলো বোরো, রোপা ও বোনা আউশ, ভুট্টা, পাট, আখ, শাকসবজি। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের আবাদ করেও চাষি ভাইয়েরা প্রচুর অর্থ আয় করতে পারেন। এ সময় চাষি ভাইয়েরা অনেক রকম ফলেরও আবাদ করেন।
ধান : বোরো ধানের জমিতে এখন থোড় আসার সময়। এ মাসে ফসলে থোড় অবস্থা দেখা গেলে জমির পানি বাড়িয়ে দিতে হবে। জমিতে পানি রাখার এ ব্যবস্থা ধানের দানা শক্ত না হওয়া পর্যন্ত ধরে রাখতে হবে। তবে ধানের দানা যখন শক্ত হয়ে আসে তখনই জমি থেকে পানি বের করে দিতে হবে। এখন বোরো ধান মাজরা পোকা, বাদামি গাছফড়িং, গান্ধি পোকা, লেদা পোকা, সবুজ পাতাফড়িং, পাতা মোড়ানো পোকাসহ বিভিন্ন ধরনের পোকায় আক্রান্ত হয়। সঙ্গে সঙ্গে এ মাসেই বিভিন্ন ধরনের রোগেও বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাধারণত যেসব রোগ এ ফসলে দেখা যায় তা হলো বাদামি দাগ রোগ, পাতা ঝলসানো রোগ ও বস্নাস্ট রোগ। এসব কারণে ধানের জমিকে এখন সার্বিক পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। জমিতে এসব রোগ বা পোকা আক্রমণ যাতে না হয় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। জমিতে পোকার আক্রমণ হলে তা দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে। ধানের জমির পোকা দমনের জন্য জমিতে বিভিন্ন স্থানে বাঁশের খুঁটি অথবা শাখাযুক্ত ডালপালা পুঁতে দিতে হবে। এর ফলে জমিতে পাখির আনাগোনা বেড়ে যায়। এসব পাখি ডালে বসে এবং তাদের আহার হিসেবে জমির পোকা খেয়ে ফসলকে সুস্থ রাখে।
এ ছাড়া আপনি বোরো ধানের বীজও আবাদ করতে পারেন। অবশ্যই দেখতে হবে এসব জমিতে যেন পর্যাপ্ত পানি থাকে। তবে আপনি কোনো অবস্থাতেই হাইব্রিড ধানের জমি থেকে ভবিষ্যতে আবাদের জন্য বীজ সংগ্রহ করবেন না। এ মৌসুমে অনেকেই হাইব্রিড ধানের আবাদ করেছেন। কেননা হাইব্রিড ধানের বীজ তৈরি করে গবেষণা খামার ও সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলো। কারণ হাইব্রিড বীজ হলো জিন দ্বারা প্রক্রিয়াজাত করা একধরনের বিশেষ বীজ। এসব বীজ উৎপাদনের সূক্ষ্ম তাপমাত্রা, পরিমাণমতো সার নির্ধারণ, হিসাব করে জমিতে বীজ বপন ও তার সঠিক পরিচর্যা প্রভৃতি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি রাখতে হবে।
এ মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সিলেট অঞ্চলে দেশি আউশ এবং মাসের পুরো সময় ধরেই জমিতে ব্রি-আউশ ধানের জাতগুলো জমিতে রোপণ করা যেতে পারে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে আউশ আবাদের এসব জমিন যেন বন্যামুক্ত হয়। আউশ ধানের জমিতে চারা অবস্থায় দু-তিন বার নিড়ানি দিতে হয়। এতে জমি পরিষ্কার থাকে। এ ছাড়া শ্রাবণের মাঝামাঝি পর্যন্ত জমিতে পোকার আক্রমণ দেখা যায়। মাজরা পোকা এখন ফসলের কুশি বা শীষের ক্ষতি করে। আউশ ফসল এভাবে আক্রান্ত হলে কুশি অবস্থায় ফুল আসার পর গাছের সাদা শীর্ষ দেখা যায়। জমিতে এ পোকা দমনের জন্য সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনাগুলো অনুসরণ করা উত্তম।
পাট : এ মাসেই তোষা পাটের বীজ বোনার জন্য উপযুক্ত সময়। বর্ষায় পানি দাঁড়ায় না এ ধরনের জমিতেই তোষা পাটের বীজ বুনতে হয়। তোষা পাটের যেসব উন্নত জাত রয়েছে তা হলো ফাল্গুনী তোষা, ও এম-১, ও-৪ এবং ও-৭২। এসব বীজ জমিতে বপনের আগে তা কীটনাশক দিয়ে শোধন করে নিতে হবে। এতে ফসলের বালাইয়ের আক্রমণও কম দেখা যায়। এখন পাটের জমি তৈরি করার জন্য এ মাসেই বৃষ্টির পরে জমিতে চাষ ও মই দিয়ে দিতে হবে। এ ছাড়া জমি তৈরির সময় এতে প্রয়োজনীয় জৈব ও রাসায়নিক সারও দিতে হবে। এখন খরা থাকলে জমিতে সেচ দিতে হবে। এ সময় পাটে ক্ষুদ্র লাল মাকড়ের আক্রমণ দেখা যায়। এ অবস্থায় থাকলে তা থিয়োভিট ৮০ ডবিস্নউ জি অথবা রিপকর্ড ১০ ইসি অথবা সালফোটাক্স ৮০ ডবিস্নউ পি এগুলোর যে কোনো একটি ব্যবহারের মাধ্যমে দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভুট্টা : এখন ভুট্টা সংগ্রহের সময়। এখন ভুট্টার মোচা খড়ের মতো রঙ হয় এবং এ অবস্থা হলেই গাছ থেকে এসব মোচা সংগ্রহ করতে হয়। আপনি এখন হাঁস-মুরগির খামারি বা গবাদিপশুর মালিকদের কাছে পশুর খাবার হিসেবে এ ভুট্টা সহজেই বিক্রি করতে পারেন এবং নিজের পশুপাখির খাবার হিসেবেও এ ফসল ব্যবহার করতে পারবেন। খরিফ মৌসুমে এখন অনেকে আবার ভুট্টার আবাদও করেছেন। জমিতে ভুট্টার বয়স ২০-২৫ দিন হলে ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। এখন জমিতে ভুট্টা গাছ বেশ বাড়ন্ত পর্যায়ে ও অনেক গাছে এখন ফুল আসে। গাছে ফুল দেখা গেলে তখন গাছের পাতা ছেঁটে দিতে হেব। এ সময় জমিতে
পানি সেচ দেয়া এবং জমির আগাছা পরিষ্কারসহ অনেক স্থানেই প্রয়োজনে সার উপরিপ্রয়োগ করা যায়।
আখ : এ মাসে আখের জমির মাটি চাষ করতে হয়। প্রয়োজন হলে আখ ফসলে সার উপরিপ্রয়োগ করা যায়।
শাক-সবজি : আপনারা অনেকেই এ মাসে গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষ শুরু করেছেন। তবে শাসসবজি যারা আগে আবাদ করেছেন তারা এসবের পরিচর্যা করতে পারেন। এ সময় আপনি গ্রীষ্মকালীন টমেটোর আবাদ করতে পারেন। এ জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট গ্রীষ্মকালীন টমেটোর কয়েকটি জাতও উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বারি টমেটো-৪, ৫, ৬, ১০ ও ১১। পরমাণু কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এ সময়ের জন্য দুটি জাত উদ্ভাবন করেছে তা হলো বিনা টমেটো-১ ও ২। এ সময় জমিতে গ্রীষ্মকালীন শাকসবজির বীজ, চারা বা কন্দ বপন বা রোপণ করা যায় যেমন পেঁপে, লালশাক, পুঁই, ডাঁটা, গিমা কলমি, লাউ, বেগুন, চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, শসা, ঢেঁড়স, কাঁকরোল, ঝিঙা, মরিচ, শিম, চিচিঙ্গা, করলা, বরবটি একং ওল, মুখিসহ সব ধরনের কচু। এসব লাগানোর জন্য সঠিক দূরত্ব, রোপণ গর্তের আকার বা গভীরতা, সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি প্রভৃতি বিষয়ে আপনাকে সঠিক ধারণা রাখতে হবে। এ জন্য আপনি নিকটস্থ উপ-সহকারী কৃষি অফিসারের পরামর্শ নিতে পারেন।
মসলা : এ মাসে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ শুরু করা যেতে পারে। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের চারা তৈরি করে নিয়ে পরে তা মূল জমিতে রোপণ করা যায়। এতে পেঁয়াজ চাষ থেকে লাভ বেশি পাওয়া যাবে। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের উন্নত জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে বারি পেঁয়াজ-২ ও ৩ এবং এন-৫৩। এ মাসে আপনি আদা বা হলুদের রোগমুক্ত, সতেজ কন্দ জমিতে রোপণ করতে পারবেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট উদ্ভাবিত উন্নত যেসব হলুদের জাত রয়েছে তা হলো বারি হলুদ-১, ২ ও ৩। এ ছাড়া উন্নত আদার জাত হলো বারি আদা-১। আদা ও হলুদ মূল-জাতীয় ফসল বলে এ ফসলের জমির মাটি অনেক গভীর পর্যন্ত আলগা থাকে। এ জন্য জমিতে পানি যেন না দাঁড়ায় সেদিকে চাষি ভাইদের বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে। এ মাসে বীজতলা তৈরি ও মরিচের বীজ করা যায়। এক থেকে দেড় মাস পরে চারা উঠিয়ে এসব মূল জমিতে রোপণ করা যায়।
ফল : এ সময় আমবাগানের পোকামাকড় দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে। এ মাসে ফলে পোকামাকড় বিশেষ করে হপার পোকার আক্রমণ বেশি দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে গাছে রেলোথ্রিন ১০ইসি, টাফ্গর ৪০ইসি, সাইপারমার ১০ইসি, সবিক্রন ৪২৫ইসি এগুলোর যে কোনো একটি ব্যবহার করতে পারেন।
গবাদিপশু ও পাখি : এ মাসে কড়া রোদ। এ সময় গবাদিপশুকে বাইরে রাখা যাবে না। গরমে এসব পশু-পাখি অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। তাই গরু-ছাগলকে খোলামেলা ছায়াযুক্ত জায়গায় রাখতে হবে। এ ছাড়া এখন গবাদিপশুকে খাওয়ানোর জন্য সুষম খাবার দিতে হবে। কাঁচা ঘাসের ব্যবস্থা করতে হবে। আপনার পশু এখন বাদলা, তড়কা, ক্ষুরারোগ প্রভৃতির মাধ্যমে আক্রান্ত হতে পারে। এসব রোগ খুবই ক্ষতিকর। এসব রোগ থেকে আপনার পশুকে রক্ষার জন্য পশুপাখিকে প্রতিষেধক টিকা দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। খামারি ভাইয়েরা হাঁস-মুরগির বার্ড ফ্লু রোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব রোগ থেকে রক্ষার জন্য আপনাকে যথাসময়ে হাঁস-মুরগির প্রতিষেধক বা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া এ মাসে মুরগির কলেরা ও রানিক্ষেত এবং হাঁস প্লেগ রোগ দ্বারাও আক্রান্ত হয়। সমস্যা সমাধানে উপজেলা পশুসম্পদ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
মৎস্য : আপনি মাছ চাষের জন্য নতুনভাবে পুকুর তৈরি করবেন এ মাসেই। তা ছাড়া পুরনো পুকুর হলে এ মাসেই তা শুকিয়ে এবং পুকুরের পাড় মেরামত করে নিতে হবে। এখন পুকুরপাড়ের গাছপালা ছাঁটাইয়ের ব্যবস্থাও নেয়া প্রয়োজন। সম্ভব হলে পুকুরে থাকা জলজ আগাছা দমনের ব্যবস্থাও এখন নিতে হবে। সমস্যা দেখা দিলে উপজেলায় গিয়ে সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা/উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
চাষি ভাইয়েরা, আপনাদের মাঠের ফসল, ফলমূল, গাছপালা, গো-সম্পদ ও মৎস্যসম্পদ এ মাসে খুবই কষ্টক্লেশ করে দেখাশোনা করতে হয় এবং এ জন্য আপনাকে প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে এসব কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে আপনি স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে পারেন।
লিখেছেনঃ কৃষিবিদ সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ।
বৈশাখ বাংলা বছরের প্রথম মাস। তাই ছয় ঋতুর প্রথম ঋতু গ্রীষ্মও শুরু হয় এ মাস দিয়েই। এ মাসে থাকে সূর্যের প্রখর তাপ, অন্যদিকে দেখা যায় কালবৈশাখী ঝড়। বৈশাখের এ আবহাওয়ায় মাঠে পাওয়া যায় ধান, পাট, শাকসবজি, মসলা, ভুট্টাসহ আরো অনেক ফসল এবং বনজ ও ফলদ গাছপালা। তবে দেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে চিনিকলে মাড়াই ও গুড় করার জন্য উৎপাদিত হয় আখ ফসল। সর্বোপরি পুকুর, নদ-নদী, খাল-বিলে মাছ চাষসহ হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলের খামারিদের কাজের প্রতিও দৃষ্টি দিতে হয় এ সময়। দেশব্যাপী এ মাসে যেসব মাঠফসলের যত্ন নিতে হয় তা হলো বোরো, রোপা ও বোনা আউশ, ভুট্টা, পাট, আখ, শাকসবজি। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের আবাদ করেও চাষি ভাইয়েরা প্রচুর অর্থ আয় করতে পারেন। এ সময় চাষি ভাইয়েরা অনেক রকম ফলেরও আবাদ করেন।
ধান : বোরো ধানের জমিতে এখন থোড় আসার সময়। এ মাসে ফসলে থোড় অবস্থা দেখা গেলে জমির পানি বাড়িয়ে দিতে হবে। জমিতে পানি রাখার এ ব্যবস্থা ধানের দানা শক্ত না হওয়া পর্যন্ত ধরে রাখতে হবে। তবে ধানের দানা যখন শক্ত হয়ে আসে তখনই জমি থেকে পানি বের করে দিতে হবে। এখন বোরো ধান মাজরা পোকা, বাদামি গাছফড়িং, গান্ধি পোকা, লেদা পোকা, সবুজ পাতাফড়িং, পাতা মোড়ানো পোকাসহ বিভিন্ন ধরনের পোকায় আক্রান্ত হয়। সঙ্গে সঙ্গে এ মাসেই বিভিন্ন ধরনের রোগেও বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাধারণত যেসব রোগ এ ফসলে দেখা যায় তা হলো বাদামি দাগ রোগ, পাতা ঝলসানো রোগ ও বস্নাস্ট রোগ। এসব কারণে ধানের জমিকে এখন সার্বিক পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। জমিতে এসব রোগ বা পোকা আক্রমণ যাতে না হয় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। জমিতে পোকার আক্রমণ হলে তা দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে। ধানের জমির পোকা দমনের জন্য জমিতে বিভিন্ন স্থানে বাঁশের খুঁটি অথবা শাখাযুক্ত ডালপালা পুঁতে দিতে হবে। এর ফলে জমিতে পাখির আনাগোনা বেড়ে যায়। এসব পাখি ডালে বসে এবং তাদের আহার হিসেবে জমির পোকা খেয়ে ফসলকে সুস্থ রাখে।
এ ছাড়া আপনি বোরো ধানের বীজও আবাদ করতে পারেন। অবশ্যই দেখতে হবে এসব জমিতে যেন পর্যাপ্ত পানি থাকে। তবে আপনি কোনো অবস্থাতেই হাইব্রিড ধানের জমি থেকে ভবিষ্যতে আবাদের জন্য বীজ সংগ্রহ করবেন না। এ মৌসুমে অনেকেই হাইব্রিড ধানের আবাদ করেছেন। কেননা হাইব্রিড ধানের বীজ তৈরি করে গবেষণা খামার ও সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলো। কারণ হাইব্রিড বীজ হলো জিন দ্বারা প্রক্রিয়াজাত করা একধরনের বিশেষ বীজ। এসব বীজ উৎপাদনের সূক্ষ্ম তাপমাত্রা, পরিমাণমতো সার নির্ধারণ, হিসাব করে জমিতে বীজ বপন ও তার সঠিক পরিচর্যা প্রভৃতি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি রাখতে হবে।
এ মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সিলেট অঞ্চলে দেশি আউশ এবং মাসের পুরো সময় ধরেই জমিতে ব্রি-আউশ ধানের জাতগুলো জমিতে রোপণ করা যেতে পারে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে আউশ আবাদের এসব জমিন যেন বন্যামুক্ত হয়। আউশ ধানের জমিতে চারা অবস্থায় দু-তিন বার নিড়ানি দিতে হয়। এতে জমি পরিষ্কার থাকে। এ ছাড়া শ্রাবণের মাঝামাঝি পর্যন্ত জমিতে পোকার আক্রমণ দেখা যায়। মাজরা পোকা এখন ফসলের কুশি বা শীষের ক্ষতি করে। আউশ ফসল এভাবে আক্রান্ত হলে কুশি অবস্থায় ফুল আসার পর গাছের সাদা শীর্ষ দেখা যায়। জমিতে এ পোকা দমনের জন্য সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনাগুলো অনুসরণ করা উত্তম।
পাট : এ মাসেই তোষা পাটের বীজ বোনার জন্য উপযুক্ত সময়। বর্ষায় পানি দাঁড়ায় না এ ধরনের জমিতেই তোষা পাটের বীজ বুনতে হয়। তোষা পাটের যেসব উন্নত জাত রয়েছে তা হলো ফাল্গুনী তোষা, ও এম-১, ও-৪ এবং ও-৭২। এসব বীজ জমিতে বপনের আগে তা কীটনাশক দিয়ে শোধন করে নিতে হবে। এতে ফসলের বালাইয়ের আক্রমণও কম দেখা যায়। এখন পাটের জমি তৈরি করার জন্য এ মাসেই বৃষ্টির পরে জমিতে চাষ ও মই দিয়ে দিতে হবে। এ ছাড়া জমি তৈরির সময় এতে প্রয়োজনীয় জৈব ও রাসায়নিক সারও দিতে হবে। এখন খরা থাকলে জমিতে সেচ দিতে হবে। এ সময় পাটে ক্ষুদ্র লাল মাকড়ের আক্রমণ দেখা যায়। এ অবস্থায় থাকলে তা থিয়োভিট ৮০ ডবিস্নউ জি অথবা রিপকর্ড ১০ ইসি অথবা সালফোটাক্স ৮০ ডবিস্নউ পি এগুলোর যে কোনো একটি ব্যবহারের মাধ্যমে দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভুট্টা : এখন ভুট্টা সংগ্রহের সময়। এখন ভুট্টার মোচা খড়ের মতো রঙ হয় এবং এ অবস্থা হলেই গাছ থেকে এসব মোচা সংগ্রহ করতে হয়। আপনি এখন হাঁস-মুরগির খামারি বা গবাদিপশুর মালিকদের কাছে পশুর খাবার হিসেবে এ ভুট্টা সহজেই বিক্রি করতে পারেন এবং নিজের পশুপাখির খাবার হিসেবেও এ ফসল ব্যবহার করতে পারবেন। খরিফ মৌসুমে এখন অনেকে আবার ভুট্টার আবাদও করেছেন। জমিতে ভুট্টার বয়স ২০-২৫ দিন হলে ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। এখন জমিতে ভুট্টা গাছ বেশ বাড়ন্ত পর্যায়ে ও অনেক গাছে এখন ফুল আসে। গাছে ফুল দেখা গেলে তখন গাছের পাতা ছেঁটে দিতে হেব। এ সময় জমিতে
পানি সেচ দেয়া এবং জমির আগাছা পরিষ্কারসহ অনেক স্থানেই প্রয়োজনে সার উপরিপ্রয়োগ করা যায়।
আখ : এ মাসে আখের জমির মাটি চাষ করতে হয়। প্রয়োজন হলে আখ ফসলে সার উপরিপ্রয়োগ করা যায়।
শাক-সবজি : আপনারা অনেকেই এ মাসে গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষ শুরু করেছেন। তবে শাসসবজি যারা আগে আবাদ করেছেন তারা এসবের পরিচর্যা করতে পারেন। এ সময় আপনি গ্রীষ্মকালীন টমেটোর আবাদ করতে পারেন। এ জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট গ্রীষ্মকালীন টমেটোর কয়েকটি জাতও উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বারি টমেটো-৪, ৫, ৬, ১০ ও ১১। পরমাণু কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এ সময়ের জন্য দুটি জাত উদ্ভাবন করেছে তা হলো বিনা টমেটো-১ ও ২। এ সময় জমিতে গ্রীষ্মকালীন শাকসবজির বীজ, চারা বা কন্দ বপন বা রোপণ করা যায় যেমন পেঁপে, লালশাক, পুঁই, ডাঁটা, গিমা কলমি, লাউ, বেগুন, চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, শসা, ঢেঁড়স, কাঁকরোল, ঝিঙা, মরিচ, শিম, চিচিঙ্গা, করলা, বরবটি একং ওল, মুখিসহ সব ধরনের কচু। এসব লাগানোর জন্য সঠিক দূরত্ব, রোপণ গর্তের আকার বা গভীরতা, সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি প্রভৃতি বিষয়ে আপনাকে সঠিক ধারণা রাখতে হবে। এ জন্য আপনি নিকটস্থ উপ-সহকারী কৃষি অফিসারের পরামর্শ নিতে পারেন।
মসলা : এ মাসে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ শুরু করা যেতে পারে। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের চারা তৈরি করে নিয়ে পরে তা মূল জমিতে রোপণ করা যায়। এতে পেঁয়াজ চাষ থেকে লাভ বেশি পাওয়া যাবে। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের উন্নত জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে বারি পেঁয়াজ-২ ও ৩ এবং এন-৫৩। এ মাসে আপনি আদা বা হলুদের রোগমুক্ত, সতেজ কন্দ জমিতে রোপণ করতে পারবেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট উদ্ভাবিত উন্নত যেসব হলুদের জাত রয়েছে তা হলো বারি হলুদ-১, ২ ও ৩। এ ছাড়া উন্নত আদার জাত হলো বারি আদা-১। আদা ও হলুদ মূল-জাতীয় ফসল বলে এ ফসলের জমির মাটি অনেক গভীর পর্যন্ত আলগা থাকে। এ জন্য জমিতে পানি যেন না দাঁড়ায় সেদিকে চাষি ভাইদের বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে। এ মাসে বীজতলা তৈরি ও মরিচের বীজ করা যায়। এক থেকে দেড় মাস পরে চারা উঠিয়ে এসব মূল জমিতে রোপণ করা যায়।
ফল : এ সময় আমবাগানের পোকামাকড় দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে। এ মাসে ফলে পোকামাকড় বিশেষ করে হপার পোকার আক্রমণ বেশি দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে গাছে রেলোথ্রিন ১০ইসি, টাফ্গর ৪০ইসি, সাইপারমার ১০ইসি, সবিক্রন ৪২৫ইসি এগুলোর যে কোনো একটি ব্যবহার করতে পারেন।
গবাদিপশু ও পাখি : এ মাসে কড়া রোদ। এ সময় গবাদিপশুকে বাইরে রাখা যাবে না। গরমে এসব পশু-পাখি অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। তাই গরু-ছাগলকে খোলামেলা ছায়াযুক্ত জায়গায় রাখতে হবে। এ ছাড়া এখন গবাদিপশুকে খাওয়ানোর জন্য সুষম খাবার দিতে হবে। কাঁচা ঘাসের ব্যবস্থা করতে হবে। আপনার পশু এখন বাদলা, তড়কা, ক্ষুরারোগ প্রভৃতির মাধ্যমে আক্রান্ত হতে পারে। এসব রোগ খুবই ক্ষতিকর। এসব রোগ থেকে আপনার পশুকে রক্ষার জন্য পশুপাখিকে প্রতিষেধক টিকা দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। খামারি ভাইয়েরা হাঁস-মুরগির বার্ড ফ্লু রোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব রোগ থেকে রক্ষার জন্য আপনাকে যথাসময়ে হাঁস-মুরগির প্রতিষেধক বা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া এ মাসে মুরগির কলেরা ও রানিক্ষেত এবং হাঁস প্লেগ রোগ দ্বারাও আক্রান্ত হয়। সমস্যা সমাধানে উপজেলা পশুসম্পদ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
মৎস্য : আপনি মাছ চাষের জন্য নতুনভাবে পুকুর তৈরি করবেন এ মাসেই। তা ছাড়া পুরনো পুকুর হলে এ মাসেই তা শুকিয়ে এবং পুকুরের পাড় মেরামত করে নিতে হবে। এখন পুকুরপাড়ের গাছপালা ছাঁটাইয়ের ব্যবস্থাও নেয়া প্রয়োজন। সম্ভব হলে পুকুরে থাকা জলজ আগাছা দমনের ব্যবস্থাও এখন নিতে হবে। সমস্যা দেখা দিলে উপজেলায় গিয়ে সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা/উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
চাষি ভাইয়েরা, আপনাদের মাঠের ফসল, ফলমূল, গাছপালা, গো-সম্পদ ও মৎস্যসম্পদ এ মাসে খুবই কষ্টক্লেশ করে দেখাশোনা করতে হয় এবং এ জন্য আপনাকে প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে এসব কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে আপনি স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে পারেন।
লিখেছেনঃ কৃষিবিদ সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ।
Sunday, April 9, 2017
চাষ করুন নেপিয়ার ঘাস
By:
এক ঘরে সব কিছু
On: 1:00 AM
চাষ করুন নেপিয়ার ঘাস
বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। দেশের প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। সেক্ষেত্রে হাল চাষের প্রয়োজনে অনেকেই গবাদিপশু পালন করে থাকে। আবার হালের বলদের সাথে অনেকেই ২/১টি গাভীও পালন করে থাকে। এসব গাভীর অধিকাংশই দেশী এবং তাদের দুধ উৎপাদন মোটেই উল্লেখ্যযোগ্য নয়। তবু যতটুকু দুধ পাওয়া যায় তাঁরা তা বাজারে বিক্রি করে থাকেন। যদিও মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক গাভী তুলনামূলকভাবে বেশি দুধ দেয় তারাও পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে দুধ উৎপাদন ক্ষমতা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে। এর ফলে দেশে ক্রমশই দুধের অভাব প্রকট হয়েছে Household Income and Expenditure Survey (HIES) ২০০০ অনুযায়ী ১৯৯৫-৯৬ অর্থ বছরে মাথা পিছু দুধ গ্রহণের পরিমাণ ছিল ৩২.৫ মিঃলিঃ এবং ২০০৪-০৫ অর্থ বছরে এর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৪২.৭২ মিঃলিঃ (উৎসঃ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০০৬)। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী একজন মানুষের দৈনিক ২০০ মিঃলিঃ দুধ খাওয়া প্রয়োজন। এদিক বিবেচনায় আমাদের দেশে দুধের উৎপাদন খুবই খারাপ বলা যায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরনের জন্য দেশে দুধ উৎপাদনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ অতীব জরুরি। তাছাড়া আমাদেরকে বছরে প্রায় ৪০০-৪৫০ কোটি টাকার দুধ বা দুগ্ধজাতপণ্য আমদানি করতে হয়। আমরা যদি দেশের গবাদি পশুর সঠিক পরিচর্যা ও উন্নয়নের মাধ্যমে দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারি তাহলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে অন্যদিকে তেমনি বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।
নেপিয়ার ঘাস:
দুধ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রথমেই জাতের উন্নয়ন আবশ্যক। তারপরই আসে খাদ্যের ভূমিকা। খাদ্যের মধ্যে কাঁচা ঘাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দুধ উৎপাদন বৃদ্ধিতে কাঁচা ঘাসের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ জনসংখ্যায় খুবই ঘন বসতিপূর্ণ। জমির পরিমাণ অল্প। তাই যেখানে মানুষের খাদ্য উৎপাদনেই নাভিশ্বাস উঠছে, সেখানে গবাদির জন্য খাদ্য উৎপাদন অনেকটা চ্যালেঞ্জের মুখে। তবুও যদি কৃষকভাইরা দেখেন যে ঘাস উৎপাদনের ফলে তাঁদের গাভীর দুধ উৎপাদন বাড়ছে এবং এর লভ্যাংশ দ্বারা অন্যান্য খরচ মেটানো সম্ভব, তাহলে তাঁরা গবাদিপশু পালনের দিকে ঝুঁকে পড়বেন। আর কাঁচা ঘাস সহজ প্রাপ্য হলে গাভী পালনও সহজতর হবে। তাই আধুনিক পদ্ধতিতে ঘাস চাষ করতে হবে। সেজন্য দরকার ব্যাপকভাবে উচ্চ উৎপাদশীল ঘাস চাষ। কাজেই এ বিষয়ে কৃষক ভাইদের সচেতন করতে হবে।
আমরা আজকে এমনই একটি ঘাস চাষ নিয়ে আলোচনা করবো যার উৎপাদন যথেষ্ট পরিমাণে বেশি। বাংলাদেশের প্রায় সকল এলাকায় এ ঘাস জন্মানো সম্ভব এবং তা থেকে প্রায় সারা বছরই গবাদির কাঁচা ঘাসের চাহিদা পূরণ করা যেতে পারে। এই ঘাসটির নাম নেপিয়ার।
নেপিয়ার এক প্রকার স্থায়ী ঘাস। দেখতে আখের মত, লম্বা ৬.৫-১৩.০ ফুট বা তার চেয়েও বেশি হয়ে থাকে। এই ঘাস দ্রুত বধর্নশীল, সহজে জন্মে, পুষ্টিকর, সহজপাচ্য ও খরা সহিষ্ণু। একবার রোপন করলে ৩/৪ বছর পর্যন্ত এর ফলন পাওয়া যায়। শীতকালের ২/৩ মাস ছাড়া প্রায় সারা বছরই এর উৎপাদন অব্যাহত থাকে। এই ঘাস আবাদের জন্য উঁচু ও ঢালু জমি যেমন বাড়ির পার্শ্বে উঁচু অনাবাদি জমি, পুকুরের পাড়, রাস্তার ধার ও বেড়ীবাঁধ সবচেয়ে উত্তম। ডোবা, জলভূমি কিংবা প্লাবিত হয় এমন অঞ্চলে এই ঘাস আবাদ করা যায় না।
জমি নির্বাচনঃ
পানি নিষ্কাশনের জন্য ভাল ব্যবস্থা আছে অর্থাৎ যেখানে বৃষ্টি বা বর্ষার পানি জমে থাকে না এরূপ জমি নেপিয়ার চাষের জন্য উত্তম। প্রায় সব ধরনের মাটিতেই এ ঘাস রোপন করা যায়, তবে বেলে-দোআঁশ মাটি সবচেয়ে বেশি উপযোগী।
চাষের সময়ঃ
নেপিয়ার ঘাস সারা বৎসরই রোপন করা যায়। সাধারণতঃ বর্ষা মৌসুমেই রোপন করা ভাল। বর্ষার প্রারম্ভে এই ঘাসের কাটিং বা চারা রোপন করা হয়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রথম বৃষ্টির পর জমিতে চারা বা কাটিং লাগালে প্রথম বছরেই ৩/৪ বার পর্যন্ত ঘাস কাটা যেতে পারে। চারা বা কাটিং লাগানোর পর যদি রৌদ্র হয় বা মাটিতে রস কম থাকে তাহলে চারার গোড়ায় পানি সেচ দিতে হবে।
জমিচাষ ও রোপন পদ্ধতিঃ
সমতল জমিতে ৪/৫টি চাষ ও মই দিয়ে জমি আগাছামুক্ত করে কাটিং বা চারা লাগাতে হবে। এই ঘাস আখের কাটিং-এর মত কাটিং অর্থাৎ কান্ডের দুই মাথায় কমপক্ষে দু'টি বা তিনটি গিট রেখে কাটতে হবে। এক সারি হতে অন্য সারির দূরত্ব ৩৬ ইঞ্চি এবং এক চারা হতে অন্য চারার দূরত্ব ১৮ ইঞ্চি। কাটিং ৬-৮ ইঞ্চি গভীরে রোপন করা উচিত। একটি গিট মাটির নীচে, মধ্যের গিট মাটির সমানে রেখে চারা বা কাটিং অনুমানিক ৪৫০ কৌণিকভাবে লাগাতে হয়। সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথম বৃষ্টির পর অথবা ভাদ্র মাসের শেষ ভাগে যখন বৃষ্টিপাত কম থাকে তখন নেপিয়ার ঘাস লাগানো উত্তম। অতি বৃষ্টিতে কাটিং লাগালে তা পচে যাবার সম্ভাবনা থাকে। মোথা লাগালে অনুরূপভাবে জমি তৈরি করে নির্দিষ্ট দূরত্বে গর্ত করে গর্তের মধ্যে একটি করে চারা লাগাতে হবে। সম্ভব হলে প্রতি গর্তে কিছু পচা গোবর বা মুরগীর বিষ্ঠা দেয়া উত্তম।
রাস্তা, পুকুরের বাঁধ বা পাহাড়ের ঢালু জমিতে নেপিয়ার চাষ করতে হলে প্রথমে ঢালের আগাছা কোদাল বা কাচি দ্বারা কেটে পরিষ্কার করতে হবে। এরপর নির্দিষ্ট দুরত্বে কোদাল দিয়ে ছোট ছোট গর্ত করে প্রতি গর্তে গোবর বা মুরগীর বিষ্ঠা এবং টিএসপি সার দিয়ে চারা লাগাতে হবে। চারা লাগিয়ে চার পাশ ভাল করে মাটি দিয়ে চেপে দিতে হবে যাতে চারার শিকড় মাটির সাথে লেগে থাকে।
সার ও পানি সেচ পদ্ধতিঃ
উন্নত জাতের ঘাসের ফলন বেশি পেতে হলে জমিতে প্রয়োজন অনুসারে সার দিতে হয়। জমির গুণাগুণের উপর নির্ভর করে সার ও পানি সেচ দিতে হবে। বাংলাদেশে বর্ষার সময় ৫/৭ মাস পানি সেচের প্রয়োজন হয় না, শুধু খরার সময় পানির সেচের প্রয়োজন হয়। পচা গোবর ও ফার্মজাত আবর্জনা, পচানো ঘাস হেক্টর প্রতি প্রায় ৩০০০/৪০০০ কেজি জমি চাষের সময় ভালভাবে ছিটিয়ে দিলে মাটিতে পুরোপুরি মিশে যায়। বেশি ফলন পেতে হলে এর সাথে হেক্টর প্রতি ২২৫ কেজি ইউরিয়া, ১৫০ কেজি টিএসপি এবং ৭৫ কেজি মিউরেট অব পটাশ প্রয়োগ করতে হবে। চারা রোপনের পর জমিতে চারা লেগে গেলে অর্থাৎ রোপনের প্রায় ১০/১২ দিন পর হেক্টর প্রতি ৮০ কেজি ইউরিয়া সার দিলে ভাল হয়। প্রত্যেক কাটিং-এর পর দুই সারির মাঝের জমি ভালভাবে লাঙ্গল বা কোদাল দিয়ে মাটি আলগা করে হেক্টর প্রতি ৫০ কেজি ইউরিয়া সার দিলে ভাল ফলন পাওয়া যায়। প্রথম কাটিং ৬০-৮০ দিনের মধ্যে পাওয়া যায়। বর্ষাকালে নেপিয়ারের উৎপাদন ভাল হয়। বৎসরে কমপক্ষে দু'বার (আষাঢ়-শ্রাবণ ও মাঘ-ফাল্গুন মাসে মাটি আলগা করে দিতে হবে। গ্রীষ্মকালে ১০-১২ দিন বিরতিতে এবং শীতকালে ১৫-২০ দিন বিরতিতে পানি সেচ দিলে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায়।
সাথী ঘাস চাষঃ
নেপিয়ার ঘাসের সঙ্গে শুটি চাষ করলে একদিকে যেমন জমির উর্বরতা বাড়ে অন্যদিকে ঘাসের পুষ্টিমাণও বৃদ্ধি পায়। স্থায়ী শুটি যেমন সেন্ট্রোসীমা, পয়রো, সিরাট্রো ইত্যাদি এবং অস্থায়ী শুটি যেমন বারসীম, কাউপি, মাসকলাই ও খেসারী ইত্যাদির চাষ করা যেতে পারে। দুই সারি নেপিয়ারের মাঝে এই ঘাসের চাষ করতে হয়।
ঘাস কাটার নিয়ম ও ফলনঃ
কাটিং বা মোথা লাগানোর ৬০-৭০ দিন পর প্রথমবার ঘাস সংগ্রহ করা যায় এবং এর পর প্রতি ৬-৮ সপ্তাহ পরপর জমি হতে ঘাস সংগ্রহ করা যায়। মাটির ৫-৬ ইঞ্চি উপর থেকে ঘাস কাটতে হয়। প্রথম কাটিং-এ ফলন একটু কম হলেও দ্বিতীয় কাটিং থেকে পরবর্তী ২/৩ বছর পর্যন্ত ফলন বাড়তে থাকে। এরপর আস্তে আস্তে কমতে থাকে। ৪-৪-১/২ বছর পর পুনরায় কাটিং বা মোথা লাগাতে হবে। বৎসরে প্রতি হেক্টরে ১৪০-১৮০ টনের মত ঘাস উৎপাদিত হয়। সাইলেজ করার ক্ষেত্রে ঘাসে ফুল ফোটার পূর্বে বা পর পরই কাটা ভাল। এতে খাদ্যমান বেশি থাকে।
খাওয়ানোর নিয়মঃ
জমি থেকে ঘাস কাটার পর ঘাস যাতে শুকিয়ে না যায় সেদিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে। আস্ত ঘাস গবাদিকে খেতে দিলে অপচয় বেশি হয়। তাই মেশিন, দা অথবা কাঁচি দ্বারা ২-৩ ইঞ্চি লম্বা করে কেটে খাওয়ানো ভাল। এই কাটা ঘাস খড়ের সাথে মিশিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে।
সংরক্ষণঃ
নেপিয়ার ঘাস রৌদ্রে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা সুবিধাজনক নয়, তবে রাখা যেতে পারে। কাঁচা সবুজ ঘাস ছোট ছোট খন্ড বা টুকরা করে সাইলেজ আকারে সংরক্ষণ করাই উত্তম।
সাবধানতাঃ
নেপিয়ারের জমিতে ইউরিয়া সার প্রয়োগের পর অনেক দিন খরা হলে ইউরিয়া হতে নাইট্রেট বা নাইট্রাইট ঘাসের মধ্যে উৎপন্ন হতে পারে এবং পরবর্তীতে অধিক বৃষ্টিপাত হওয়ার পর দ্রুত বেড়ে ওঠা এই ঘাস কেটে খাওয়ানো ঝুকিপূর্ণ। এতে বিষক্রিয়া হতে পারে।
নিম্নলিখিত সতর্কতা অবলম্বন করলে বিষক্রিয়ার প্রভাব থেকে গবাদিপশুকে মুক্ত রাখা যায়।
(১) জমিতে সার ছিটাবার ২ (দুই) সপ্তাহের মধ্যে ঘাস কাটা উচিত নয়।
(২) সার ছিটাবার পরে দীর্ঘ দিন খরা থাকার পর হঠাৎ অধিক বৃষ্টিপাতের পর দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া ঘাস কেটে খাওয়ানো উচিত নয়।
(৩) ঘাস কাটার একমাস পূর্বে সার ছিটানো যেতে পারে।
নেপিয়ার উচ্চ ফলনশীল ঘাস। এই ঘাস চাষের মাধ্যেমে গবাদিপশুর কাঁচা ঘাসের চাহিদা মিটানো সম্ভবপর। কাঁচা ঘাস/সাইলেজের ব্যবহার যথাযথভাবে করতে পারলে দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে যা দ্বারা ক্রমান্বয়ে দেশের দুধের চাহিদা মিটানো যাবে এবং এর ফলে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানির মাধ্যমে যে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে তা বহুল অংশে কমানো সম্ভব। বর্তমানে দুধের দাম যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে করে দুধ উৎপাদন বাড়লে কৃষকের যেমন আর্থিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি পাবে তেমনি দেশের আর্থিক অবস্থারও উন্নতি ঘটবে।
ঘাসের বীজের জন্য যোগাযোগ করতে পাড়েন-কৃষি ষ্টোর- ০১৯৭১৬২৫২৫২।
বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। দেশের প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। সেক্ষেত্রে হাল চাষের প্রয়োজনে অনেকেই গবাদিপশু পালন করে থাকে। আবার হালের বলদের সাথে অনেকেই ২/১টি গাভীও পালন করে থাকে। এসব গাভীর অধিকাংশই দেশী এবং তাদের দুধ উৎপাদন মোটেই উল্লেখ্যযোগ্য নয়। তবু যতটুকু দুধ পাওয়া যায় তাঁরা তা বাজারে বিক্রি করে থাকেন। যদিও মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক গাভী তুলনামূলকভাবে বেশি দুধ দেয় তারাও পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে দুধ উৎপাদন ক্ষমতা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে। এর ফলে দেশে ক্রমশই দুধের অভাব প্রকট হয়েছে Household Income and Expenditure Survey (HIES) ২০০০ অনুযায়ী ১৯৯৫-৯৬ অর্থ বছরে মাথা পিছু দুধ গ্রহণের পরিমাণ ছিল ৩২.৫ মিঃলিঃ এবং ২০০৪-০৫ অর্থ বছরে এর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৪২.৭২ মিঃলিঃ (উৎসঃ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০০৬)। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী একজন মানুষের দৈনিক ২০০ মিঃলিঃ দুধ খাওয়া প্রয়োজন। এদিক বিবেচনায় আমাদের দেশে দুধের উৎপাদন খুবই খারাপ বলা যায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরনের জন্য দেশে দুধ উৎপাদনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ অতীব জরুরি। তাছাড়া আমাদেরকে বছরে প্রায় ৪০০-৪৫০ কোটি টাকার দুধ বা দুগ্ধজাতপণ্য আমদানি করতে হয়। আমরা যদি দেশের গবাদি পশুর সঠিক পরিচর্যা ও উন্নয়নের মাধ্যমে দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারি তাহলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে অন্যদিকে তেমনি বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।
নেপিয়ার ঘাস:
দুধ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রথমেই জাতের উন্নয়ন আবশ্যক। তারপরই আসে খাদ্যের ভূমিকা। খাদ্যের মধ্যে কাঁচা ঘাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দুধ উৎপাদন বৃদ্ধিতে কাঁচা ঘাসের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ জনসংখ্যায় খুবই ঘন বসতিপূর্ণ। জমির পরিমাণ অল্প। তাই যেখানে মানুষের খাদ্য উৎপাদনেই নাভিশ্বাস উঠছে, সেখানে গবাদির জন্য খাদ্য উৎপাদন অনেকটা চ্যালেঞ্জের মুখে। তবুও যদি কৃষকভাইরা দেখেন যে ঘাস উৎপাদনের ফলে তাঁদের গাভীর দুধ উৎপাদন বাড়ছে এবং এর লভ্যাংশ দ্বারা অন্যান্য খরচ মেটানো সম্ভব, তাহলে তাঁরা গবাদিপশু পালনের দিকে ঝুঁকে পড়বেন। আর কাঁচা ঘাস সহজ প্রাপ্য হলে গাভী পালনও সহজতর হবে। তাই আধুনিক পদ্ধতিতে ঘাস চাষ করতে হবে। সেজন্য দরকার ব্যাপকভাবে উচ্চ উৎপাদশীল ঘাস চাষ। কাজেই এ বিষয়ে কৃষক ভাইদের সচেতন করতে হবে।
আমরা আজকে এমনই একটি ঘাস চাষ নিয়ে আলোচনা করবো যার উৎপাদন যথেষ্ট পরিমাণে বেশি। বাংলাদেশের প্রায় সকল এলাকায় এ ঘাস জন্মানো সম্ভব এবং তা থেকে প্রায় সারা বছরই গবাদির কাঁচা ঘাসের চাহিদা পূরণ করা যেতে পারে। এই ঘাসটির নাম নেপিয়ার।
নেপিয়ার এক প্রকার স্থায়ী ঘাস। দেখতে আখের মত, লম্বা ৬.৫-১৩.০ ফুট বা তার চেয়েও বেশি হয়ে থাকে। এই ঘাস দ্রুত বধর্নশীল, সহজে জন্মে, পুষ্টিকর, সহজপাচ্য ও খরা সহিষ্ণু। একবার রোপন করলে ৩/৪ বছর পর্যন্ত এর ফলন পাওয়া যায়। শীতকালের ২/৩ মাস ছাড়া প্রায় সারা বছরই এর উৎপাদন অব্যাহত থাকে। এই ঘাস আবাদের জন্য উঁচু ও ঢালু জমি যেমন বাড়ির পার্শ্বে উঁচু অনাবাদি জমি, পুকুরের পাড়, রাস্তার ধার ও বেড়ীবাঁধ সবচেয়ে উত্তম। ডোবা, জলভূমি কিংবা প্লাবিত হয় এমন অঞ্চলে এই ঘাস আবাদ করা যায় না।
জমি নির্বাচনঃ
পানি নিষ্কাশনের জন্য ভাল ব্যবস্থা আছে অর্থাৎ যেখানে বৃষ্টি বা বর্ষার পানি জমে থাকে না এরূপ জমি নেপিয়ার চাষের জন্য উত্তম। প্রায় সব ধরনের মাটিতেই এ ঘাস রোপন করা যায়, তবে বেলে-দোআঁশ মাটি সবচেয়ে বেশি উপযোগী।
চাষের সময়ঃ
নেপিয়ার ঘাস সারা বৎসরই রোপন করা যায়। সাধারণতঃ বর্ষা মৌসুমেই রোপন করা ভাল। বর্ষার প্রারম্ভে এই ঘাসের কাটিং বা চারা রোপন করা হয়। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রথম বৃষ্টির পর জমিতে চারা বা কাটিং লাগালে প্রথম বছরেই ৩/৪ বার পর্যন্ত ঘাস কাটা যেতে পারে। চারা বা কাটিং লাগানোর পর যদি রৌদ্র হয় বা মাটিতে রস কম থাকে তাহলে চারার গোড়ায় পানি সেচ দিতে হবে।
জমিচাষ ও রোপন পদ্ধতিঃ
সমতল জমিতে ৪/৫টি চাষ ও মই দিয়ে জমি আগাছামুক্ত করে কাটিং বা চারা লাগাতে হবে। এই ঘাস আখের কাটিং-এর মত কাটিং অর্থাৎ কান্ডের দুই মাথায় কমপক্ষে দু'টি বা তিনটি গিট রেখে কাটতে হবে। এক সারি হতে অন্য সারির দূরত্ব ৩৬ ইঞ্চি এবং এক চারা হতে অন্য চারার দূরত্ব ১৮ ইঞ্চি। কাটিং ৬-৮ ইঞ্চি গভীরে রোপন করা উচিত। একটি গিট মাটির নীচে, মধ্যের গিট মাটির সমানে রেখে চারা বা কাটিং অনুমানিক ৪৫০ কৌণিকভাবে লাগাতে হয়। সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রথম বৃষ্টির পর অথবা ভাদ্র মাসের শেষ ভাগে যখন বৃষ্টিপাত কম থাকে তখন নেপিয়ার ঘাস লাগানো উত্তম। অতি বৃষ্টিতে কাটিং লাগালে তা পচে যাবার সম্ভাবনা থাকে। মোথা লাগালে অনুরূপভাবে জমি তৈরি করে নির্দিষ্ট দূরত্বে গর্ত করে গর্তের মধ্যে একটি করে চারা লাগাতে হবে। সম্ভব হলে প্রতি গর্তে কিছু পচা গোবর বা মুরগীর বিষ্ঠা দেয়া উত্তম।
রাস্তা, পুকুরের বাঁধ বা পাহাড়ের ঢালু জমিতে নেপিয়ার চাষ করতে হলে প্রথমে ঢালের আগাছা কোদাল বা কাচি দ্বারা কেটে পরিষ্কার করতে হবে। এরপর নির্দিষ্ট দুরত্বে কোদাল দিয়ে ছোট ছোট গর্ত করে প্রতি গর্তে গোবর বা মুরগীর বিষ্ঠা এবং টিএসপি সার দিয়ে চারা লাগাতে হবে। চারা লাগিয়ে চার পাশ ভাল করে মাটি দিয়ে চেপে দিতে হবে যাতে চারার শিকড় মাটির সাথে লেগে থাকে।
সার ও পানি সেচ পদ্ধতিঃ
উন্নত জাতের ঘাসের ফলন বেশি পেতে হলে জমিতে প্রয়োজন অনুসারে সার দিতে হয়। জমির গুণাগুণের উপর নির্ভর করে সার ও পানি সেচ দিতে হবে। বাংলাদেশে বর্ষার সময় ৫/৭ মাস পানি সেচের প্রয়োজন হয় না, শুধু খরার সময় পানির সেচের প্রয়োজন হয়। পচা গোবর ও ফার্মজাত আবর্জনা, পচানো ঘাস হেক্টর প্রতি প্রায় ৩০০০/৪০০০ কেজি জমি চাষের সময় ভালভাবে ছিটিয়ে দিলে মাটিতে পুরোপুরি মিশে যায়। বেশি ফলন পেতে হলে এর সাথে হেক্টর প্রতি ২২৫ কেজি ইউরিয়া, ১৫০ কেজি টিএসপি এবং ৭৫ কেজি মিউরেট অব পটাশ প্রয়োগ করতে হবে। চারা রোপনের পর জমিতে চারা লেগে গেলে অর্থাৎ রোপনের প্রায় ১০/১২ দিন পর হেক্টর প্রতি ৮০ কেজি ইউরিয়া সার দিলে ভাল হয়। প্রত্যেক কাটিং-এর পর দুই সারির মাঝের জমি ভালভাবে লাঙ্গল বা কোদাল দিয়ে মাটি আলগা করে হেক্টর প্রতি ৫০ কেজি ইউরিয়া সার দিলে ভাল ফলন পাওয়া যায়। প্রথম কাটিং ৬০-৮০ দিনের মধ্যে পাওয়া যায়। বর্ষাকালে নেপিয়ারের উৎপাদন ভাল হয়। বৎসরে কমপক্ষে দু'বার (আষাঢ়-শ্রাবণ ও মাঘ-ফাল্গুন মাসে মাটি আলগা করে দিতে হবে। গ্রীষ্মকালে ১০-১২ দিন বিরতিতে এবং শীতকালে ১৫-২০ দিন বিরতিতে পানি সেচ দিলে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায়।
সাথী ঘাস চাষঃ
নেপিয়ার ঘাসের সঙ্গে শুটি চাষ করলে একদিকে যেমন জমির উর্বরতা বাড়ে অন্যদিকে ঘাসের পুষ্টিমাণও বৃদ্ধি পায়। স্থায়ী শুটি যেমন সেন্ট্রোসীমা, পয়রো, সিরাট্রো ইত্যাদি এবং অস্থায়ী শুটি যেমন বারসীম, কাউপি, মাসকলাই ও খেসারী ইত্যাদির চাষ করা যেতে পারে। দুই সারি নেপিয়ারের মাঝে এই ঘাসের চাষ করতে হয়।
ঘাস কাটার নিয়ম ও ফলনঃ
কাটিং বা মোথা লাগানোর ৬০-৭০ দিন পর প্রথমবার ঘাস সংগ্রহ করা যায় এবং এর পর প্রতি ৬-৮ সপ্তাহ পরপর জমি হতে ঘাস সংগ্রহ করা যায়। মাটির ৫-৬ ইঞ্চি উপর থেকে ঘাস কাটতে হয়। প্রথম কাটিং-এ ফলন একটু কম হলেও দ্বিতীয় কাটিং থেকে পরবর্তী ২/৩ বছর পর্যন্ত ফলন বাড়তে থাকে। এরপর আস্তে আস্তে কমতে থাকে। ৪-৪-১/২ বছর পর পুনরায় কাটিং বা মোথা লাগাতে হবে। বৎসরে প্রতি হেক্টরে ১৪০-১৮০ টনের মত ঘাস উৎপাদিত হয়। সাইলেজ করার ক্ষেত্রে ঘাসে ফুল ফোটার পূর্বে বা পর পরই কাটা ভাল। এতে খাদ্যমান বেশি থাকে।
খাওয়ানোর নিয়মঃ
জমি থেকে ঘাস কাটার পর ঘাস যাতে শুকিয়ে না যায় সেদিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে। আস্ত ঘাস গবাদিকে খেতে দিলে অপচয় বেশি হয়। তাই মেশিন, দা অথবা কাঁচি দ্বারা ২-৩ ইঞ্চি লম্বা করে কেটে খাওয়ানো ভাল। এই কাটা ঘাস খড়ের সাথে মিশিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে।
সংরক্ষণঃ
নেপিয়ার ঘাস রৌদ্রে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা সুবিধাজনক নয়, তবে রাখা যেতে পারে। কাঁচা সবুজ ঘাস ছোট ছোট খন্ড বা টুকরা করে সাইলেজ আকারে সংরক্ষণ করাই উত্তম।
সাবধানতাঃ
নেপিয়ারের জমিতে ইউরিয়া সার প্রয়োগের পর অনেক দিন খরা হলে ইউরিয়া হতে নাইট্রেট বা নাইট্রাইট ঘাসের মধ্যে উৎপন্ন হতে পারে এবং পরবর্তীতে অধিক বৃষ্টিপাত হওয়ার পর দ্রুত বেড়ে ওঠা এই ঘাস কেটে খাওয়ানো ঝুকিপূর্ণ। এতে বিষক্রিয়া হতে পারে।
নিম্নলিখিত সতর্কতা অবলম্বন করলে বিষক্রিয়ার প্রভাব থেকে গবাদিপশুকে মুক্ত রাখা যায়।
(১) জমিতে সার ছিটাবার ২ (দুই) সপ্তাহের মধ্যে ঘাস কাটা উচিত নয়।
(২) সার ছিটাবার পরে দীর্ঘ দিন খরা থাকার পর হঠাৎ অধিক বৃষ্টিপাতের পর দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া ঘাস কেটে খাওয়ানো উচিত নয়।
(৩) ঘাস কাটার একমাস পূর্বে সার ছিটানো যেতে পারে।
নেপিয়ার উচ্চ ফলনশীল ঘাস। এই ঘাস চাষের মাধ্যেমে গবাদিপশুর কাঁচা ঘাসের চাহিদা মিটানো সম্ভবপর। কাঁচা ঘাস/সাইলেজের ব্যবহার যথাযথভাবে করতে পারলে দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে যা দ্বারা ক্রমান্বয়ে দেশের দুধের চাহিদা মিটানো যাবে এবং এর ফলে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানির মাধ্যমে যে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে তা বহুল অংশে কমানো সম্ভব। বর্তমানে দুধের দাম যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে করে দুধ উৎপাদন বাড়লে কৃষকের যেমন আর্থিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি পাবে তেমনি দেশের আর্থিক অবস্থারও উন্নতি ঘটবে।
ঘাসের বীজের জন্য যোগাযোগ করতে পাড়েন-কৃষি ষ্টোর- ০১৯৭১৬২৫২৫২।
বর্ষার মৌসুমে গো-খাদ্য সংরক্ষণ
By:
এক ঘরে সব কিছু
On: 12:23 AM
বর্ষার মৌসুমে গো-খাদ্য সংরক্ষণ
বাংলাদেশে গো-খাদ্যের খুব অভাব রয়েছে। দেশে চারণ ভূমির পরিমাণ অত্যন্ত কম থাকার ফলে চারণ ভূমিতে গবাদিপশু চরে যৎসামান্য পরিমাণে কাঁচা ঘাস খেতে পারে। কৃষক ভাইয়েরা ফসলা জমিতে ঘাস চাষ করে গরুকে খাওয়াতে তেমন একটা আগ্রহ প্রকাশ করেন না।
আবার বাংলাদেশে গম ও ডাল জাতীয় ফসলের উৎপাদন মোটেও আশানুরূপ নয়। ফলে ভূষি উৎপাদন চাহিদার তুলনায় অনেক কম হয়। এ কারণে বাজারে ভূষির দাম সবসময় অত্যধিক থাকে। তবে আঁশ জাতীয় খাদ্য যেমন খড় ও দেশী ঘাস সে তুলনায় বেশি পরিমাণে উৎপাদিত হলেও কৃষক ভাইয়েরা সে সবের সংরক্ষণ পদ্ধতির বিষয়ে তেমন ওয়াকিবহাল নন। ফলে এ জাতীয় খাদ্যের উদ্বৃত্ত অংশ পচে নষ্ট হয়ে যায়।দেশে প্রতি বছর বন্যাতেও প্রচুর পরিমাণে গো-খাদ্য বিভিন্নভাবে বিনষ্ট হয়।ধান কাটার সময় কিছু এলাকার কৃষক ভাইয়েরা ধান গাছের ৬-৮ ইঞ্চি উপরে না কেটে প্রায় ১-১১২ ফুট উপর থেকে কেটে নেয়। ফলে খড়ের উৎপাদন স্বভাবতই কম হয়। তাই ভিজা খড় ও কাঁচা ঘাস সংগ্রহ ও সংরক্ষণ পদ্ধতির উপর কৃষক ভাইদের সম্যক জ্ঞান থাকা একান্ত প্রয়োজন।
বর্ষাকালে কাঁচা ও ভিজা খড় সংরক্ষণ পদ্ধতি:
আমাদের দেশে গরুর প্রধান খাদ্য হল খড়। বর্ষাকালে ইরি-বোরো ও আউশ ধানের খড় বেশির ভাগ ভিজে পচে নষ্ট হয়ে যায়। এ পচনশীল খড় বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সংরক্ষণ করা হলে দেশে গো-খাদ্যের চাহিদা অনেকটা পূরণ হতে পারে। ইউরিয়া সহযোগে খড় প্রক্রিয়াজাতকরণের পদ্ধতি নিম্নে বর্ণিত হলো।
উপকরণঃ
প্রতি ১০০ কেজি খড়ের জন্য ১.৫-২.০০ কেজি ইউরিয়া সার এবং আচ্ছাদন দেয়ার জন্য পলিথিন পেপার।
প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি:
প্রথমে পানি জমে না এমন একটি উঁচু ও সমতল স্থান বাছাই করতে হবে।
বাছাইকৃত উঁচু জায়গাটি পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।
এরপর পলিথিনের উপরে খড় বিছাতে হবে এবং
৮-১০ ইঞ্চি করে খড়ের স্তর করে তার উপর পরিমাণ মত ইউরিয়া ছিটাতে হবে।
খড়ের স্তর করার সময় পা দিয়ে খুব চেপে চেপে খড় রাখতে হবে যাতে খড়ের গাদায় বাতাস না থাকে।
খড়ের গাদা তৈরি শেষ হয়ে গেলে পলিথিন দিয়ে এমনভাবে ঢেকে দিতে হবে যাতে বাহির থেকে বাতাস এবং পানি প্রবেশ না করতে পারে।
প্রক্রিয়াজাত খড় খাওয়ানোর নিয়ম:
৭-১০ দিন পর গাদা থেকে খড় বের করার পর কিছুক্ষণ ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে তারপর খাওয়াতে হবে। এর ফলে গাদায় উৎপাদিত এমোনিয়া গ্যাস বের হয়ে যায়। এ খড়ের সাথে শতকরা ৪০ ভাগ হারে সাধারণ শুকনা খড় মিশিয়ে খাওয়ালে এমোনিয়াজনিত কোনো বিষক্রিয়া হবার সম্ভাবনা থাকে না।
লক্ষণীয় বিষয়সমূহ:
এই খড়ের গাদা প্রয়োজনে ১ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায় এবং প্রয়োজনের সময় গরুকে খাওয়ানো যায়। ভিজা খড় সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যদি খড়ে বেশি পানি থাকে তবে কিছুক্ষণ উঁচু জায়গায় রাখলে পানি কমে যাবে অথবা এই খড়ের সাথে স্তরে স্তরে শুকনা খড় মিশানো উচিত। খড়ের গাদা ঢাকার জন্য ছেঁড়া বা ফাটা পলিথিন ব্যবহার করা যাবে না। গাদা এমনভাবে ঢেকে রাখতে হবে যাতে এর ভিতর বাতাস বা পানি প্রবেশ করতে না পারে।
বর্ষাকালে কাঁচা ঘাস সংরক্ষণ পদ্ধতি:
আমাদের দেশে বর্ষাকালে দূর্বা, বাকসা, আরাইল, সেচি, দল, শস্য ক্ষেতের আগাছা ইত্যাদি জাতীয় কাঁচা ঘাস প্রচুর পাওয়া যায় অথবা জমিতে চাষ করা নেপিয়ার, পারা, ভুট্টা, সরগম, ওট ইত্যাদি খুব সহজেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সাইলেজ করে ১ বছর পর্যন্ত পশুকে খাওয়ানো যেতে পারে।
১০০ ঘনফুট একটি মাটির গর্তে ২.৫-৩.০ মেট্রিক টন ঘাস সংরক্ষণ করা যায়।
উপকরণ:
১০০ কেজি কাঁচা ঘাসের জন্য ৩-৪ কেজি চিটা গুড়, চিটা গুড়ের সমপরিমাণ পানি, শুকনা খড় ও পলিথিন কভার।
সাইলেজ প্রস্তুতের পদ্ধতি:
প্রথমে পানি জমে না এমন একটি উঁচু স্থান নিবার্চন করতে হবে।
সেখানে এমনভাবে একটি গর্ত খুঁড়তে হবে যাতে গর্তের নীচের অংশ পাতিলের তলার মত অথবা ইংরেজি বর্ণমালার ইউ এর আকৃতি হয় যাতে সেখানে কোনো কৌণিক অংশ না থাকে।
এরপর গর্তের মাটিতে পুরু করে শুকনা খড় বিছিয়ে দিতে হবে।
এবার গর্তে পরতে পরতে সবুজ ঘাস ও শুকনা খড় বিছিয়ে দিতে হবে ( প্রতি পরতে ৩০০ কেজি সবুজ ঘাস ও ১৫ কেজি শুকনো খড় থাকবে)।
প্রতি পরতে পরিমাণ মতা চিটাগুড় পানিতে গুলে ঘাসের উপর ছিটিয়ে দিতে হবে (৯-১২ কেজি চিটা গুড় ও ৮-১০ কেজি পানি)।
মাঝে মাঝে ঘাসের স্তরের উপর পা দিয়ে চাপ দিতে হবে যাতে ভিতরে বাতাস না থাকতে পারে।
ঘাসে পানির পরিমাণ বেশি হলে স্তরের মাঝে শুকনা খড় দিতে হবে। ফলে খড় অতিরিক্ত পানি শুষে নেবে।
এই ভাবে স্তরে স্তরে ঘাস সাজিয়ে মাটির উপরে কোমর সমান উঁচু করতে হবে।
সবশেষে শুকনা খড় দিয়ে পুরু করে আস্তরণ দ্বারা পলিথিন দিয়ে ভালোভাবে ঘাসের গাদা ঢেকে দিতে হবে।
লক্ষণীয় বিষয়:
এই ঘাসের গাদা ১ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। কিছু দিন পর ঘাসের রং বিবর্ণ হলেও তা খাওয়ানোর উপযোগী থাকে। চিটাগুড় পাতলা হলে পরিমাণ বাড়িয়ে পানি কম করে মেশাতে হবে।
ভুট্টার গাছ সংরক্ষণ ও আপদকালীন খাদ্য সরবরাহ:
বর্ষাকালে ভুট্টা সংগ্রহ করার পর ভুট্টার গাছ শুকিয়ে দা দিয়ে ছোট ছোট টুকরা করে বস্তায় বেঁধে রেখে দিলে বর্ষা বা বন্যার সময় আপদকালে গরুকে খাওয়ানো যায়। ভুট্টা গাছের টুকরা পানিতে ভিজিয়ে চিটাগুড় দিয়ে মাখিয়ে দিলে গরু খায়।
শুকনো খড় সংরক্ষণ:
শুকনো খড়ের সতূপে খড়ের গুণগত মান ভালো আছে কিনা তা মাঝে মধ্যে সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। কারণ, সতূপ (পালা) তৈরির সময় কোনো ত্রুটি থাকলে বর্ষাকালে সতূপের ভিতর পানি ঢুকে খড় পচে যেতে পারে। ঐ পচা খড় গরুকে খাওয়ালে বিষক্রিয়া বা ডায়রিয়া হতে পারে।
ভূষি ও কুড়া সংরক্ষণ:
বর্ষাকালে ভূষি ও চাউলের কুড়ার বস্তার মুখ খুব ভালো করে বেঁধে ঘরের মাচার উপরে রাখতে হবে। দানাদার খাদ্যের বস্তা কখনও মাটিতে রাখা যাবে না। অবশ্যই মাচার উপর শুষ্ক স্থানে রাখতে হবে। তা না হলে এতে ছত্রাক জন্মাবে। এ জাতীয় খাদ্য খেলে গবাদিপশু বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে।
এ সমস্ত কারণে গবাদিপশুকে খাদ্য প্রদানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সজাগ হতে হবে।গবাদিপশুর উৎপাদন ও দৈহিক ওজন বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য যথারীতি সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি। এছাড়াও গর্ভবতী গাভীর জন্য পুষ্টিকর খাদ্য প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন যে সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান গবাদিপশু সহজে বিশেষ করে পুষ্টিহীনতা, পেটের পীড়া ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হয় না।এজন্য স্বাস্থ্যসম্মতভাবে গো-খাদ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে গো-খাদ্যের খুব অভাব রয়েছে। দেশে চারণ ভূমির পরিমাণ অত্যন্ত কম থাকার ফলে চারণ ভূমিতে গবাদিপশু চরে যৎসামান্য পরিমাণে কাঁচা ঘাস খেতে পারে। কৃষক ভাইয়েরা ফসলা জমিতে ঘাস চাষ করে গরুকে খাওয়াতে তেমন একটা আগ্রহ প্রকাশ করেন না।
আবার বাংলাদেশে গম ও ডাল জাতীয় ফসলের উৎপাদন মোটেও আশানুরূপ নয়। ফলে ভূষি উৎপাদন চাহিদার তুলনায় অনেক কম হয়। এ কারণে বাজারে ভূষির দাম সবসময় অত্যধিক থাকে। তবে আঁশ জাতীয় খাদ্য যেমন খড় ও দেশী ঘাস সে তুলনায় বেশি পরিমাণে উৎপাদিত হলেও কৃষক ভাইয়েরা সে সবের সংরক্ষণ পদ্ধতির বিষয়ে তেমন ওয়াকিবহাল নন। ফলে এ জাতীয় খাদ্যের উদ্বৃত্ত অংশ পচে নষ্ট হয়ে যায়।দেশে প্রতি বছর বন্যাতেও প্রচুর পরিমাণে গো-খাদ্য বিভিন্নভাবে বিনষ্ট হয়।ধান কাটার সময় কিছু এলাকার কৃষক ভাইয়েরা ধান গাছের ৬-৮ ইঞ্চি উপরে না কেটে প্রায় ১-১১২ ফুট উপর থেকে কেটে নেয়। ফলে খড়ের উৎপাদন স্বভাবতই কম হয়। তাই ভিজা খড় ও কাঁচা ঘাস সংগ্রহ ও সংরক্ষণ পদ্ধতির উপর কৃষক ভাইদের সম্যক জ্ঞান থাকা একান্ত প্রয়োজন।
বর্ষাকালে কাঁচা ও ভিজা খড় সংরক্ষণ পদ্ধতি:
আমাদের দেশে গরুর প্রধান খাদ্য হল খড়। বর্ষাকালে ইরি-বোরো ও আউশ ধানের খড় বেশির ভাগ ভিজে পচে নষ্ট হয়ে যায়। এ পচনশীল খড় বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সংরক্ষণ করা হলে দেশে গো-খাদ্যের চাহিদা অনেকটা পূরণ হতে পারে। ইউরিয়া সহযোগে খড় প্রক্রিয়াজাতকরণের পদ্ধতি নিম্নে বর্ণিত হলো।
উপকরণঃ
প্রতি ১০০ কেজি খড়ের জন্য ১.৫-২.০০ কেজি ইউরিয়া সার এবং আচ্ছাদন দেয়ার জন্য পলিথিন পেপার।
প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি:
প্রথমে পানি জমে না এমন একটি উঁচু ও সমতল স্থান বাছাই করতে হবে।
বাছাইকৃত উঁচু জায়গাটি পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে।
এরপর পলিথিনের উপরে খড় বিছাতে হবে এবং
৮-১০ ইঞ্চি করে খড়ের স্তর করে তার উপর পরিমাণ মত ইউরিয়া ছিটাতে হবে।
খড়ের স্তর করার সময় পা দিয়ে খুব চেপে চেপে খড় রাখতে হবে যাতে খড়ের গাদায় বাতাস না থাকে।
খড়ের গাদা তৈরি শেষ হয়ে গেলে পলিথিন দিয়ে এমনভাবে ঢেকে দিতে হবে যাতে বাহির থেকে বাতাস এবং পানি প্রবেশ না করতে পারে।
প্রক্রিয়াজাত খড় খাওয়ানোর নিয়ম:
৭-১০ দিন পর গাদা থেকে খড় বের করার পর কিছুক্ষণ ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে তারপর খাওয়াতে হবে। এর ফলে গাদায় উৎপাদিত এমোনিয়া গ্যাস বের হয়ে যায়। এ খড়ের সাথে শতকরা ৪০ ভাগ হারে সাধারণ শুকনা খড় মিশিয়ে খাওয়ালে এমোনিয়াজনিত কোনো বিষক্রিয়া হবার সম্ভাবনা থাকে না।
লক্ষণীয় বিষয়সমূহ:
এই খড়ের গাদা প্রয়োজনে ১ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায় এবং প্রয়োজনের সময় গরুকে খাওয়ানো যায়। ভিজা খড় সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যদি খড়ে বেশি পানি থাকে তবে কিছুক্ষণ উঁচু জায়গায় রাখলে পানি কমে যাবে অথবা এই খড়ের সাথে স্তরে স্তরে শুকনা খড় মিশানো উচিত। খড়ের গাদা ঢাকার জন্য ছেঁড়া বা ফাটা পলিথিন ব্যবহার করা যাবে না। গাদা এমনভাবে ঢেকে রাখতে হবে যাতে এর ভিতর বাতাস বা পানি প্রবেশ করতে না পারে।
বর্ষাকালে কাঁচা ঘাস সংরক্ষণ পদ্ধতি:
আমাদের দেশে বর্ষাকালে দূর্বা, বাকসা, আরাইল, সেচি, দল, শস্য ক্ষেতের আগাছা ইত্যাদি জাতীয় কাঁচা ঘাস প্রচুর পাওয়া যায় অথবা জমিতে চাষ করা নেপিয়ার, পারা, ভুট্টা, সরগম, ওট ইত্যাদি খুব সহজেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সাইলেজ করে ১ বছর পর্যন্ত পশুকে খাওয়ানো যেতে পারে।
১০০ ঘনফুট একটি মাটির গর্তে ২.৫-৩.০ মেট্রিক টন ঘাস সংরক্ষণ করা যায়।
উপকরণ:
১০০ কেজি কাঁচা ঘাসের জন্য ৩-৪ কেজি চিটা গুড়, চিটা গুড়ের সমপরিমাণ পানি, শুকনা খড় ও পলিথিন কভার।
সাইলেজ প্রস্তুতের পদ্ধতি:
প্রথমে পানি জমে না এমন একটি উঁচু স্থান নিবার্চন করতে হবে।
সেখানে এমনভাবে একটি গর্ত খুঁড়তে হবে যাতে গর্তের নীচের অংশ পাতিলের তলার মত অথবা ইংরেজি বর্ণমালার ইউ এর আকৃতি হয় যাতে সেখানে কোনো কৌণিক অংশ না থাকে।
এরপর গর্তের মাটিতে পুরু করে শুকনা খড় বিছিয়ে দিতে হবে।
এবার গর্তে পরতে পরতে সবুজ ঘাস ও শুকনা খড় বিছিয়ে দিতে হবে ( প্রতি পরতে ৩০০ কেজি সবুজ ঘাস ও ১৫ কেজি শুকনো খড় থাকবে)।
প্রতি পরতে পরিমাণ মতা চিটাগুড় পানিতে গুলে ঘাসের উপর ছিটিয়ে দিতে হবে (৯-১২ কেজি চিটা গুড় ও ৮-১০ কেজি পানি)।
মাঝে মাঝে ঘাসের স্তরের উপর পা দিয়ে চাপ দিতে হবে যাতে ভিতরে বাতাস না থাকতে পারে।
ঘাসে পানির পরিমাণ বেশি হলে স্তরের মাঝে শুকনা খড় দিতে হবে। ফলে খড় অতিরিক্ত পানি শুষে নেবে।
এই ভাবে স্তরে স্তরে ঘাস সাজিয়ে মাটির উপরে কোমর সমান উঁচু করতে হবে।
সবশেষে শুকনা খড় দিয়ে পুরু করে আস্তরণ দ্বারা পলিথিন দিয়ে ভালোভাবে ঘাসের গাদা ঢেকে দিতে হবে।
লক্ষণীয় বিষয়:
এই ঘাসের গাদা ১ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। কিছু দিন পর ঘাসের রং বিবর্ণ হলেও তা খাওয়ানোর উপযোগী থাকে। চিটাগুড় পাতলা হলে পরিমাণ বাড়িয়ে পানি কম করে মেশাতে হবে।
ভুট্টার গাছ সংরক্ষণ ও আপদকালীন খাদ্য সরবরাহ:
বর্ষাকালে ভুট্টা সংগ্রহ করার পর ভুট্টার গাছ শুকিয়ে দা দিয়ে ছোট ছোট টুকরা করে বস্তায় বেঁধে রেখে দিলে বর্ষা বা বন্যার সময় আপদকালে গরুকে খাওয়ানো যায়। ভুট্টা গাছের টুকরা পানিতে ভিজিয়ে চিটাগুড় দিয়ে মাখিয়ে দিলে গরু খায়।
শুকনো খড় সংরক্ষণ:
শুকনো খড়ের সতূপে খড়ের গুণগত মান ভালো আছে কিনা তা মাঝে মধ্যে সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। কারণ, সতূপ (পালা) তৈরির সময় কোনো ত্রুটি থাকলে বর্ষাকালে সতূপের ভিতর পানি ঢুকে খড় পচে যেতে পারে। ঐ পচা খড় গরুকে খাওয়ালে বিষক্রিয়া বা ডায়রিয়া হতে পারে।
ভূষি ও কুড়া সংরক্ষণ:
বর্ষাকালে ভূষি ও চাউলের কুড়ার বস্তার মুখ খুব ভালো করে বেঁধে ঘরের মাচার উপরে রাখতে হবে। দানাদার খাদ্যের বস্তা কখনও মাটিতে রাখা যাবে না। অবশ্যই মাচার উপর শুষ্ক স্থানে রাখতে হবে। তা না হলে এতে ছত্রাক জন্মাবে। এ জাতীয় খাদ্য খেলে গবাদিপশু বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে।
এ সমস্ত কারণে গবাদিপশুকে খাদ্য প্রদানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সজাগ হতে হবে।গবাদিপশুর উৎপাদন ও দৈহিক ওজন বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য যথারীতি সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি। এছাড়াও গর্ভবতী গাভীর জন্য পুষ্টিকর খাদ্য প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন যে সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান গবাদিপশু সহজে বিশেষ করে পুষ্টিহীনতা, পেটের পীড়া ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হয় না।এজন্য স্বাস্থ্যসম্মতভাবে গো-খাদ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
Subscribe to:
Posts (Atom)