Showing posts with label ফুল চাষ. Show all posts
Showing posts with label ফুল চাষ. Show all posts

Monday, July 24, 2017

জীবাণু সার

  • Share The Gag
  • জীবাণু সার 

    জীবাণু সার সাধারণত উপকারী অণুজীব দিয়ে প্রস্তুত করা হয় যা বীজের উপর, শিকড় অথবা মাটিতে প্রয়োগ করলে তাদের জৈবিক কার্যকলাপ দ্বারা পুষ্টির প্রাপ্যতা বাড়ায়।

    তারা মাটিতে ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র উদ্ভিদের বৃদ্ধি ঘটায়  এবং মাটির স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।

     

    জীবাণু সারের উপকারিতা :

    ১. মাটি সমৃদ্ধিকরণ করতে সাহায্য করে।

    ২. বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন আবদ্ধ করে।

    ৩. মাটি বৈশিষ্ট্য উন্নত করে এবং মাটির উর্বরতা ধরে রাখে।

    ৪. উর্বরতা স্থায়ীকরণের উপযুক্ত জীবাণু প্রতিরোধক হিসাবে বা জৈব আবর্জনার পচন ঘটিয়ে বা হরমোনের সাহায্যে উদ্ভিদের বৃদ্ধি উদ্দীপিত করে।

    ৫. দীর্ঘদিন মাটির উর্বরতা বজায় থাকে।

    ৬. এরা পরিবেশের বন্ধু সাথে পরিবেশের কোনো ক্ষতি করেনা।

    ৭. পুষ্টি উপাদেয় দ্রবনীয়তা বা শোষণের জন্য তা গ্রহণ যোগ্যতা বাড়ে ও সহজলভ্য হয়।

    ৮. কম দামে পাওয়া যায় ফলে চাষের খরচও কমে।

    ৯. অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের যোগান হ্রাসে সাহায্য করে।

     

    জীবাণু সারের প্রকারভেদ 

    ১. নাইট্রোজেনের জন্য 


    • শিম্বগোত্রীয় ফসলের জন্য রাইজোবিয়াম।

    • অশিম্বগোত্রীয় ফসলের জন্য আজোসপিরিল্লাম এবং আজোতোব্যাক্টর।

    • আখের জন্য শুধুমাত্র এসিটোব্যাক্টর।

    • নীচু জমির ধানের জন্য নীল সবুজ শ্যাওলা এবং অ্যাজোলা।

    • ঝাউ এবং আলনাস গাছের জন্য ফ্র্যাংকিয়া।



    রাইজোবিয়াম 

    রাইজোবিয়াম মাটির বসবাসকারী একটি ব্যাকটেরিয়া। এরা বায়ুমণ্ডলের মুক্ত নাইট্রোজেনকে আবদ্ধ করে।

    তারা শিম্বগোত্রীয় এবং অশিম্বগোত্রীয় মিথোজীবী সংস্থা গঠন করে যেমন, পারসপোনিয়া।

    শিকড়ের শাখাপ্রশাখা দিয়ে মূল শিকড়ের মধ্যে রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে। তারা শিকড় থেকে একপ্রকার উদ্দীপক রস নিঃসৃত করতে কর্মক্ষম।

    এই রঞ্জক পদার্থ গুলি ব্যাকটেরিয়ায় অক্সিজেন সরবরাহ করে নাইট্রোজেনে পরিণত হয় এবং গুটি তৈরী করে।

    এই গুটির ভেতর রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়া বসবাস করে ও নাইট্রোজেনকে নাইট্রোজেনাস আবদ্ধ গুটিতে পরিণত করে।

    ব্যাকটেরিয়া বা গাছ কেউই আলাদা ভাবে নাইট্রোজেন আবদ্ধ করতে পারেনা।

    এই গুটি তৈরীকারী ব্যাকটেরিয়া দুইটি জাতের - যেমন রাইজোবিয়াম ও ব্রাডিরাইজোবিয়াম এবং দ্রুত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত রাইজোবিয়াকে রাইজোবিয়াম বলে।

     

    টেবিল : বিভিন্ন ফসলের জন্য উপযুক্ত রাইজোবিয়াম স্পিসিস 




































    রাইজোবিয়াম স্পিসিসশস্য
    আর. লীগুমিনোসেরামমটর (পাইসাম), খেসারী, ভিসিয়া, মুসুর (লেন্স)
    আর. ট্রিফলিবারসীম (ট্রিফলিয়াম)
    আর. ফাসিওলিকিডনী বিন (ফাঁসিওলাস)
    আর. লুপিনিলুপিনাস, অর্নিথোপাস্
    আর. জেপোনিকামসয়াবিন (গ্লাইসিন)
    আর মেলিলোটিমেলিলোটাস, লুসার্ন (মেডিকাগো), মেথি গাছ (ট্রাইগোনেল্লা)
    রাইজোবিয়াম স্পিসিসবরবটি, ক্লাস্টার বিন, মুগ বিন, কলাই, অড়হর,

    চীনাবাদাম, মথবিন, ধৈঞ্চা, তিসি, গ্লাইরিসিডিয়া,

    বাবলা ইত্যাদি



    রাইজোবিয়াম টিকাকরণ পদ্ধতি : 


    রাইজোবিয়ামের টিকা করণের দ্বারা বীজ শোধন করা সবচেয়ে উপযুক্ত পদ্ধতি। সংযুক্তির জন্য একপ্রকার আঠা ব্যবহার করা হয়।

    এক হেক্টর জমিতে শিম্ব গোত্রীয় ফসলের  বীজ চাষের জন্য ৯০০ গ্রাম এই ব্যাক্টেরিয়া মিশ্রিত মাটি প্রয়োজন হয়।

    ১০ শতাংশ গুড়ের সংমিশ্রন সাধারণত বীজের উপর আঠা হিসাবে ব্যবহার করা হয়। প্রথমে এই গুড়ের মিশ্রণ বীজের উপর ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

    ফলে বীজের উপর একটি পাতলা স্তরের সৃষ্টি হয়। স্তরের গুড় মিশ্রিত ফাইবারের ঘনত্ব যথোপযুক্ত হলে ব্যাকটেরিয়ার টিকাকরণের জন্য বীজের উপর তা ছিটিয়ে দিতে হবে এবং

    ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। পরে টিকাকৃত বীজগুলি একটি পলিথিনের উপর বিছিয়ে একরাত্রির জন্য ছায়ায় শুকিয়ে নিতে হবে ।

     

    অ্যাজোটোব্যক্টর :

    অ্যাজোটোব্যক্টর ব্যাকটেরিয়া পরভোজী ও মুক্তভাবে বসবাসকারী। এটি ক্ষারীয় কিংবা নিরপেক্ষ মাটিতে থাকে।

    ভারতবর্ষের সমস্ত আবাদি জমিতে অ্যাজোটোব্যক্টর কোরাক্কমের উপস্থিতি সাধারণ ভাবে লক্ষণীয়। পরিবেশের মুক্ত নাইট্রোজেন আবদ্ধ করা ছাড়াও

    এটি বিভিন্ন ধরণের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক হরমোন যেমন অক্সিন, জিব্বারেলিন এবং বিভিন্ন ভিটামিন প্রভৃতির সমন্বয় সাধন করে।

    অ্যাজোটোব্যক্টর ব্যাকটেরিয়া কিছু প্রজাতির মধ্যে কিছু কিছু ছত্রাকের উপর ছত্রাকনাশক কার্যকারিতা লক্ষ্য করা যায়।

    ধান, ভুট্টা, তুলা, আখ, যব, সবজি ও বিভিন্ন বাগিচা ফসলের উপর অ্যাজোটোব্যক্টরের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

    অনাবাদি জমিতে এই ব্যাকটেরিয়াটির উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু মাটিতে জৈব সারের উপস্থিতি ব্যাক্টেরিয়াটির গুণন ক্ষমতা ও

    নাইট্রোজেন অবদ্ধিকরণ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে।

    মাঠে পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে পেঁয়াজ, বেগুন, টমেটো অথবা বাঁধাকপি প্রভৃতি শস্যের বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক অঞ্চলে চাষ করার সময় যদি

    এই ব্যাক্টেরিয়ার দ্বারা বীজ অথবা চারা গাছের টিকাকরণ করানো যায় তাহলে সুফল পাওয়া যায়।

    অ্যাজোটোব্যক্টরের টিকাকরণ দ্বারা সাধারণ জমিতে নাইট্রোজেন সারের পরিমান ১০-২০ শতাংশ হ্রাস করানো যায়।

     

    অ্যাজোসপাইরিলাম :

    এরা মুক্ত অমিথোজীবী ব্যাকটেরিয়া (গুটি তৈরী করতে পারে না কিন্তু শিকড়ে বসবাসকারী জীবাণুর সাথে একটি সংযুক্তি করে।

    অ্যাজোসপাইরিলাম প্রজাতির বিশেষত যেমন ভুট্টা, জোয়ার, আখ ইত্যাদি C4 উদ্ভিদ অনেক উদ্ভিদের সাথে একটি সংযুক্তি প্রতিষ্ঠা করে।

    এরা অন্যান্য জীবাণুর সাথে খুব সহজেই সংযুক্ত হতে পারে। উচ্চ প্রজাতির গাছের সাথেও একটা সংযুক্তি স্থাপন গাছের সাথে করতে পারে।

    এটা শিকড় দিয়ে ঢোকে বা শিকড়ে বসবাস করে, কিন্তু কোনো গুটি দেখতে পাওয়া যায়না। এই ব্যাকটেরিয়াটি প্রতি হেক্টরে ২০ থেকে ৪০ কেজি নাইট্রোজেন আবদ্ধ করতে পারে।

    এই ব্যাক্টেরিয়াটি গাছের দৈহিক বৃদ্ধিতে সাহায্য করে এবং নিম্নলিখিত প্রজাতিগুলি ২৫-৩০ শতাংশ নাইট্রোজেন সারের সঞ্চয় করে।

     

    অ্যাসিটোব্যক্টর :

    অ্যাসিটোব্যক্টর ডিয়াজোট্রফিকস একটি সদ্য আবিষ্কৃত নাইট্রোজেন ফিক্সিং ব্যাকটেরিয়া যা আখের সাথে সম্পর্ক যুক্ত।

    আখের পাতা, কুঁড়ি এবং কাণ্ডের নমুনার পরীক্ষার মাধ্যমে এটিকে আলাদা করে দেখা হয়েছে।

    এটি অম্লিক এবং লবণাক্ত এবং সুক্রোজ পছন্দকারী ব্যাকটেরিয়া, যা প্রতি হেক্টরে ২০০ কেজি পর্যন্ত নাইট্রোজেন আবদ্ধ রাখতে পারে।

    জমিতে টিকা দেওয়ার পর আখের ফলন বৃদ্ধি পায়। অ্যাসিটোব্যক্টর প্রয়োগ করার পর অক্সিন এবং এন্টিবায়োটিক জাতীয় পদার্থের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

     

    নীলাভ সবুজ শৈবাল :

    নীলাভ সবুজ শৈবালের কয়েকটি প্রজাতি বায়ুমণ্ডলের নাইট্রোজেন আবদ্ধ করতে পারে।

    অ্যানাবিনা ও নষ্টক নামে দুইটি প্রজাতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

    নীলাভ সবুজ শৈবাল প্রতি হেক্টরে প্রায় ১৫-৪৫ কেজি নাইট্রোজেন আবদ্ধ করতে পারে।

    নীলাভ সবুজ শৈবালের ভালো বৃদ্ধির জন্য জমিতে ২ থেকে ১০ সেমি জল সবসময় প্রয়োজন।

    ২৫-৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতে এটি বৃদ্ধি পেতে পারে।

    উজ্জ্বল সূর্যালোক বৃদ্ধির হার বাড়ে কিন্তু বৃষ্টিপাত এবং মেঘলা আকাশ বৃদ্ধির হার কমায়।

    মাটির পিএইচ এর মান যদি ৭ থেকে ৮ এর মধ্যে হয় এবং মাটিতে বেশি পরিমাণে জৈব পদার্থ থাকলে এই শ্যাওলার বৃদ্ধি ভালো হয়।

    ২ মি X ২ মি X ০.২৫ মি আকারের লোহার ট্রে তে নীল সবুজ শৈবালের টিকা মিশ্রিত করা হয়।

    এই ট্রে গুলো পলিথিনের চাদর মোড়া থাকে।

    প্রতিটি ট্রে তে ২০ কেজি মাটি এবং ৪০০ গ্রাম সুপারফসফেট দিয়ে ভরে নিতে হবে।

    ট্রে তে নীল সবুজ শৈবাল টিকা থাকে এবং এটা জলে ডোবানো থাকে।

    ট্রে তে সাধারণত ৫ - ১০ সেমি জল সব সময় জমিয়ে রাখতে হবে। এক সপ্তাহের মধ্যে, একটি পুরু শ্যাওলার গাদ তৈরী হবে।

    এই পর্যায়ে, জল বের করে দিয়ে মাটি শুকিয়ে দিতে হবে।

    শুকনো নীল সবুজ শৈবালগুলি উঠিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে এবং চাষের জমিতে ব্যবহার করা হয়।

    জমিতে ধান রোপনের পর নীল সবুজ শৈবাল টিকা জমিতে প্রয়োগ করা হয়।

    প্রতি হেক্টর জমিতে ১০ কেজি / টিকার প্রয়োজন হয়।

    বেশি পরিমানে নাইট্রোজেন স্থায়ীকরণের জন্য, খামারসার ৩-৪ টন/ হেক্টর এবং সুপারফসফেট ২০০ কেজি / হেক্টর প্রয়োগ করা দরকার।

     

    অ্যাজোলা :

    অ্যাজোলা পরিষ্কার জলের মুক্ত ভাসমান একধরণের ফার্ন। ভারতের প্রচলিত প্রজাতি হলো অ্যাজোলা পিনাটা। অ্যাজোলা ফার্নের পাতার ভাগের মধ্যে অবস্থিত নীল সবুজ শৈবালের আনাবেইনা প্রজাতি নাইট্রোজেন আবদ্ধ করে।

    অ্যাজোলার একটি পুরু স্তর প্রতি হেক্টর জমিতে ৩০ - ৪০ কেজি নাইট্রোজেন সরবরাহ করতে সক্ষম। নীল - সবুজ শ্যাওলাগুলি কম তাপমাত্রা সহ্য করতে পারেনা।

    ২০ - ৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় অ্যাজোলার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে। বর্ষাকালের যখন তখন বৃষ্টি ও মেঘাছন্ন আবহাওয়াতে এই শ্যাওলার বৃদ্ধি ভালো হয়।

    অ্যাজোলা চাষের জন্য মাটির পিএইচ ৫.৫ - ৭ হওয়া জরুরি।অ্যাজোলা নার্সারি গাছের ছায়াতে হওয়া বাঞ্ছনীয়। ৪ মি x ২ মি এর ছোট খন্ডে ৩০-৪০ সেমি উচ্চতার আল দিয়ে চারিধার ঘিরে নার্সারি প্রস্তুত করা হয়।

    প্লট থেকে জল বেরিয়ে যাওয়া আটকাতে বাঁধ গুলি প্লাস্টিক - পলিথিন দিয়ে ঘিরে দিতে হবে। প্লটটির মধ্যে জল দ্বারা পরিপূর্ণ রাখতে হয় এবং প্রতি বর্গমিটার ০.১ - ০.৫ কেজি অ্যাজোলা প্রয়োগ করতে হবে।

    পাতা খাওয়া শুককীট এবং অন্যান্য পোকা দমনের জন্য কার্বোফুরণ দানা ১.২ গ্রাম/মিটার২ মাত্রাতে প্রয়োগ করতে হবে।

    অ্যাজোলা সবুজ সার হিসাবে এবং দ্বিতীয় ফসল হিসাবে চাষের জমিতে প্রয়োগ করা হয়।

    রোপনের ২-৩ সপ্তাহ আগে প্লাবিত জমিতে অ্যাজোলা সবুজ সার হিসাবে ফসল বৃদ্ধির জন্য চাষ করা হয়।

    পরে, জল নিষ্কাশিত করে ভালো ভাবে চাষ দিয়ে অ্যাজোলা মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়।

    দ্বিতীয় ফসল হিসাবে, চারা রোপনের ১ সপ্তাহ পর প্রতি হেক্টর জমিতে ১০০০ - ৫০০০ কেজি অ্যাজোলা প্রয়োগ করলে ভালো হয়।

    যখন অ্যাজোলার একটি পুরু চাদর তৈরী হবে তখন পা দিয়ে মাড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে।

    আবার জমিতে অ্যাজোলা দেখা দিলে তা একই ভাবে পা দিয়ে মাড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে।

    অ্যাজোলার ভালো বৃদ্ধির জন্য জমিতে ৫-১০ সেমি জল দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় সুপারফসফেট ২৫-৫০ কেজি/হেক্টর প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

     

    ফ্রাঙ্কিয়া :

    ফ্রাঙ্কিয়া একধরণের অ্যাকটিনোমাইসিটিস। এরাও বায়ুমণ্ডলের মুক্ত নাইট্রোজেন আবদ্ধ করতে পারে।

    মিথোজীবি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এরা কয়েকটি অশিম্বগোত্রীয় গাছের শিকড়ে গুটি বা অর্বুদ তৈরী করতে পারে।

    যেমন - ঝাউ বা অ্যালনাস। পতিত জমিতে ঝাউ চাষ করে জমির উর্বরতা শক্তি বাড়ানো যায়।

    কৃষি বনায়ন পদ্ধতিতে নাইট্রোজেনের অভাব রয়েছে এমন জমিতে ঝাউগাছ লাগানো যথেষ্ট উপকারী।

    ফ্রাঙ্কিয়ার শিকড়ে গুটি তৈরির শুরুতে একটি ছোট ফোলা ভাব দেখা যায় যা শেকড়ের আগায় পরে খাঁজ তৈরী করে এবং থোকা থোকা গুটি আকৃতির সৃষ্টি হয়।

    এই অ্যাকটিনোমাইসেটিসের টিকাকরণের ফলে ঝাউ ও অ্যালনাস গাছের বৃদ্ধি, গুটি তৈরী, গুটির নাইট্রোজেন উৎসেচকের কার্যকারিতা ও গুটির শুষ্ক ওজন বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়।

     

    ২. ফসফরাসের জন্য :

    ফসফরাস দ্রবীভূতকারী ছত্রাক : এসপারজিলাস, পেনিসিলিয়াম

    ফসফরাস দ্রবীভূতকারী ব্যাকটেরিয়া : ব্যাসিলাস, সিউডোমোনাস

    ফসফরাস শোষণকারী : ভেসিকুলার আরবাসকুলার মাইকোরাইজা (ভি এ এম)

    বহিঃ মাইকোরাইজা : পিসোলিথাস, রাইজোপোগন

    আন্তঃ মাইকোরাইজা: গ্লোমাস, গিগাসপোরা

     

    ফসফরাস ধারণকারী অণুজীব (পি এস এম) :

    নাইট্রোজেনের পরের প্রাথমিক খাদ্যমৌল হিসাবে ফসফরাস অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূর্ণ। বাইরের থেকে প্রয়োগ করা ফসফরাসের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ গাছের দ্বারা উদ্ধৃত করা যায়।

    বাকি অংশ মাটিতে আবদ্ধ হয়। এই আবদ্ধ ফসফরাস কখনোই সহজলভ্য নয়। এই আবদ্ধ ফসফরাসকে কতগুলি পরভোজী জীবাণু দ্রবীভূত করে এবং জৈব অ্যাসিড ও

    উৎসেচক তৈরী করে ফলে দ্রবণীয় ফসফরাস উদ্ভিদ দ্বারা সহজে গৃহীত হয়। এই ধরণের অণুজীবগুলিকে ফসফরাস দ্ৰবীভূতকারী অণুজীব বলা হয়।

    যেমন ব্যাসিলাস, অ্যাসপারজিলাস, পেনিসিলিয়াম এবং ট্রাইকোডারমা প্রভৃতি। যখন রক ফসফেটের উপর এই অণুবীজ গুলি বিক্রিয়া ঘটায়, তখন দ্রবণীয় ফসফরাস ও

    সাইট্রেটে পরিণত হয়। এই অনুজীবগুলি জৈব আবর্জনায় অবস্থিত জৈব ফসফেট যৌগগুলির ধাতব পরিণতিতে সাহায্য করে।

    কম্পোস্ট তৈরির সময় থার্মোফিলিক ধাপের পর এই সব অণুজীবের ব্যবহার কম্পোস্ট প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।

    নিরপেক্ষ ও ক্ষারীয় মাটিতে এই ব্যাকটেরিয়ার ব্যবহার ও অম্লিক মাটিতে ছত্রাকের ব্যবহার করে বাইরে থেকে প্রয়োগ করা ফসফরাসের গ্রহণ ক্ষমতা উন্নতি ঘটানো যায় এবং

    ফসফরাস আবদ্ধিকরণ ও বোধ করা যায়।

     

    ভ্যাসিক্যুলার আরবাসকুলার মাইকোরাইজা :

    ছত্রাক ও গাছের শিকড়ের মধ্যে যে পারস্পরিক সংযুক্তি দেখা যায় তা মাইকোরাইজা নামে পরিচিত। একে যে কোনো একটি বাস্তুতন্ত্রে এই মাইকোরাইজার সংহতিগুলি সমস্ত গাছের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়।

    বিভিন্ন প্রকার ডালজাতীয় ও ঘাস জাতীয় পরিবারের গাছের ক্ষেত্রে এবং ভিএএম এর উপনিবেশন অত্যন্ত সমর্থন যোগ্য।

    ভিএএম ফসফরাস, জিঙ্ক এবং সালফারের বদল ঘটাতে সাহায্য করে। এছাড়াও তামা, পটাশিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম, লোহা ও ম্যাগনেসিয়াম প্রভৃতি উদ্ভিদ পুষ্টি উপাদানের মাটি থেকে শেকড়ে পরিবহন ঘটায়।

    এরা গাছের শেকড়ে প্রবেশ করে এবং শেকড় ও আন্তঃকোষের সাথে ছত্রাকের একটি বাধ্যতামূলক আন্তঃসংহতি স্থাপিত হয়।

    এরপর একটি থলি তৈরী হয় যেখানে উদ্ভিদ খাদ্য উপাদানগুলি জমা হয় এবং একটি অর্বাসকুলার তৈরী করে সমস্ত পুষ্টি উপাদান গুলি ফানেলের দ্বারা শিকড়ে প্রবেশ করে।

    ভিএএম ছত্রাকের হাইফি গুলি অদ্রবণীয় সহজলভ্য নয় এমন ফসফরাসকে দ্রবীভূত করতে পারেনা, অধিকন্তু এই অদ্রবণীয় ফসফরাসের  নিজেদের প্রয়োজনে আত্তিকরণ ঘটায়।

    এমনকি এই উপাদানগুলির বিভিন্ন ধরণের বদল ঘটিয়ে আশ্রয়দাতার শিকড়ে সরবরাহ করে। ভিএএম ছত্রাক শিকড় দ্বারা গাছের জলশোষণ ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটায়।

    দুই ধরণের মাইকোরাইজা দেখা যায় : বহিঃ মাইকোরাইজা ও আন্তঃ মাইকোরাইজা।

    বহিঃ বা আন্তঃ মাইকোরাইজার ক্ষেত্রে ছত্রাকের হাইফিগুলি শিকড়ের এপিডারমিস ও কর্টেস কোষের মধ্যে বাইরের দিকে বিস্তৃত হয়। উদ্ভিদ এক্ট মাইকোরাইজার  দ্বারা সংক্রামিত হয়।

    এন্ডো বা অন্তঃ মাইকোরাইজার তিনটি উপবিভাগ দেখা যায়। এগুলির মধ্যে ভিএএম কৃষি ক্ষেত্রে সব থেকে প্রচলিত একটি নাম।

    এরা শিকড়ের কর্টেস অঞ্চলে একটি অভ্যন্তরীণ জালক তৈরী করে যা পরে মাটিতে বিস্তার লাভ করে এবং জল ও পুষ্টি উপাদান শোষণে সাহায্য করে।

    এই ভিএএম মাইকোরাইজা একবীজপত্রী, বাৎসরিক বা বহুবর্ষজীবি প্রভৃতি গাছের সাথে সংহতি স্থাপন করতে পারে।

    খাদ্যশস্য ও ডালজাতীয় শস্যের পর্যায়ক্রমে খামারজাত সারের প্রয়োগ দ্বারা ভিএএম এর কর্ম ক্ষমতা তরান্বিত করা যায়।

    আবার রাসায়নিক ছত্রাকনাশকের ব্যবহারে ভিএএম এর স্থায়িত্ব হ্রাস করে।

    জৈব সার দ্বারা বীজের টিকাকরণ :

    জৈব সার দ্বারা বীজের টিকাকরণের সাথে সাথে উপযুক্ত পরিবেশে বিভিন্ন শস্যের মূলেও টিকাকরণ করা যায়। মাটিতেও সরাসরি জৈব সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। জৈব সারের প্রয়োগ পদ্ধতিগুলি নিম্নে বলা হল -

    বীজের টিকাকরণ :

    এটি অতি প্রচলিত পদ্ধতি। গুড়ের ১০ শতাংশ দ্রবণে জৈব সার মিশিয়ে বীজের টিকাকরণ করা হয়।

    মিশ্রিত কাথ বীজের উপর ছড়িয়ে একটি সিমেন্টের মেঝেতে বিছিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নেওয়া হয় এবং দেখতে হবে বীজের গায়ে চারিদিকে যেন একটি পাতলা আস্তরণ থাকে।

    এরপর এই বীজগুলি ছায়ায় সারারাত্রি ধরে শুকিয়ে নিয়ে ব্যবহার করতে হবে। সাধারণত এক হেক্টর জমিতে ডাল শস্য বীজের জন্য ৭৫০ গ্রাম জৈব সারের প্রয়োজন।

    শেকড় ও চারা গাছের টিকা ব্যবস্থাপনা :

    চারা রোপনের পূর্বে, চারা গাছের শেকড় ৩০ মিনিট ধরে বায়োফার্টিলাইজার দ্রবণে ডুবিয়ে তারপরে রোপণ করতে হবে।

    একএকর জমিতে চারা রোপনের জন্য ২ - ২.৫ কেজি বায়োফার্টিলাইজারের প্রয়োজন হয়।

    প্রথমে একটি বালতিতে প্রয়োজন মতো জল নিয়ে বায়োফার্টিলাইজার ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে।

    এরপর চারা গাছের শেকড়গুলি এই মিশ্রিত জলে ডুবিয়ে টিকাকরণ করে নিতে হবে। এরপরেই মূল জমিতে চারা রোপন করতে হবে।

    টমেটো, ধান, পেঁয়াজ এবং বিভিন্ন ধরণের শীতকালীন সবজির (ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি প্রভৃতি) চাষ এই পদ্ধতিতে করলে সুফল পাওয়া যায়।

     

    মাটিতে প্রয়োগ :

    সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো শস্যের নির্দিষ্ট স্থানে জীবাণু সার প্রয়োগের প্রয়োজন হলে এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়।

    সাধারণত বিভিন্ন প্রকার ফল, আখ এবং অন্যান্য শস্যের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি ব্যবহার হয়।

    ফলের গাছ রোপনের সময় ২০ গ্রাম জীবাণু সার কম্পোস্টের সাথে মিশিয়ে গাছের চারিদিকে রিং বরাবর মাটিতে প্রয়োগ করতে হবে।

    গাছের পূর্ণাঙ্গ প্রাপ্তি ঘটলে আমরা আরো কিছু পরিমাণ জীবাণু সার গাছের রিং বরাবর প্রয়োগ করতে পারি।

    জীবাণু সার সরাসরি মাটিতে প্রয়োগ করলে পরিমানে ৪ - ২০ গুন বেশি প্রয়োজন হয়।

    জীবাণু সার প্রয়োগের পূর্বে তা ভালোভাবে বিয়োজিত পরিমান মতো খামার সারের সাথে মিশিয়ে ২৪ ঘন্টা রেখে পুষ্টিসাধন করে নিতে হয়।

    খামার সার জীবাণু সারের বাহক ও খাদ্য হিসাবে কাজ করে।

     

    স্বটিকাকরণ বা কন্দের টিকাকরণ :

    এই পদ্ধতির দ্বারা অ্যাজোটোব্যক্টরের টিকাকরণ সহজে করা যায়। প্রথমে একটি ড্রামে করে ৫০ লিটার জল নিয়ে ৪ - ৫ কেজি জীবাণু সার ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে।

    এক একর জমিতে চারা রোপনের জন্য প্রয়োজনীয় চারা এই মিশ্রিত দ্রবণে ডুবিয়ে নিতে হবে।

    ঠিক এই ভাবে, আলু রোপনের পূর্বে উক্ত মিশ্রণে তা ডুবিয়ে নিয়ে ছায়ায় শুকনো করে জমিতে রোপন করতে হবে।

    Friday, July 7, 2017

    ছাদে অথবা ব্যাপক ভিত্তিতে জারবেরা চাষ

  • Share The Gag
  • ছাদে অথবা ব্যাপক ভিত্তিতে জারবেরা চাষ

    পরিচিতিঃ

    জারবেরা এ্যাসটারেসী পরিবারভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বানিজ্যিক ফুল । জার্র্মান পরিবেশবিদ ট্রগোট জার্বার এর নামানুসারে এ ফুলটির নামকরন করা হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক ফুল বানিজ্যে কাট ফ্লাওয়ার (Cut flower) হিসেবে উল্লেখযোগ্য ১০টি ফুলের মধ্যে অন্যতম কাট ফ্লাওয়ারের জন্য ও বেশী দিন ফুলদানীতে সতেজ রাখতে জারবেরার জুড়ি নেই।

     

    জাত

    জারবেরা গণের আওতায় ৪০টির মত প্রজাতি আছে।এ গুলির মধ্যে জারবেরা জ্যামেসোনি প্রজাতিটি চাষাবাদ হচেছ সংকরায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে Gerbera jamesonii এর অনেক জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট  জারবেরা  ফুলের বারি জারবেরা-১ ও বারি জারবেরা-২ দুইটি জাত উদ্ভাবন করেছে।

     

    জলবায়ু

    জলবায়ু জারবেরা কষ্টসহিষ্ণু গাছ এবং সব ধরনের জলবায়ুতে কমবেশী জন্মায়।গ্রীষ্মমন্ডলীয় (Temperate)  অঞ্চলে উন্মুক্ত স্থানে পলিসেডে এবং নাতিশীতোষ্ণ (Tropical) অঞ্চলে এ ফুলটিকে গ্রীনহাউজে চাষাবাদ করার পরামর্শ দেয়া হয়।

     

    নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ (Protective condition)

    বাংলাদেশে জারবেরা শীতকালীন সময়ে খোলা মাঠে বা উন্মুক্ত স্থানে চাষ করা হয়। গ্রীষ্মকালীন সময়ে পলিসেডে চাষ করা হয়। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চাষাবাদ করলে যদিও খরচের প্রধান্য অধিক পড়ে তথাপিও ফুলের গুনগতমান ও ফলন বৃদ্ধি এবং রোগপোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষার জন্য নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে জারবেরা চাষ করা জরুরী প্রয়োজন ।উজ্জ্বল সূর্যালোক জারবেরা গাছের বৃদ্ধি ও গুনগতমান সম্পন্ন ফুল উৎপাদনে সহায়ক। কিন্তু গ্রীষ্মকালে উন্নত ফুল উৎপাদনের জন্য হালকা ছায়া (৩০%) প্রদান করতে হয়। জারবেরা চাষে অনুকূল দিবাকালীন তাপমাত্রা ১৬-২০০ সেন্টিগ্রেড এবং রাত্রিকালীন তাপমাত্রা ১০ - ১২০ সেন্টিগ্রেড । উচচ তাপমাত্রায়  গাছে ফুল আসে ঠিকই,  কিন্তু ফুল ততটা গুনগত মান সম্পন্ন হয় না

     

    মাটিঃ

    সুনিষ্কাশিত, উর্বর দো-আঁশ বা বেলে দো-আঁশ মাটি  জারবেরা চাষের জন্য উত্তম। মাটির পি এইচ মান ৫.৫-৭.০ এর মধ্যে থাকা উচিত । জারবেরার জমিতে প্রচুর জৈব সার থাকা দরকার এজন্য পরিমিত পরিমানে গোবর সার, পাতাপচা সার, Cocodust ইত্যাদি প্রয়োগ করতে হবে ।

     

    বংশবৃদ্ধিঃ

    (ক) বীজের মাধ্যমে (By seed)

    বীজের মাধ্যমে জারবেরার বংশবৃদ্ধি করা যায়। এ পদ্ধতিতে উৎপাদিত গাছে মাতৃগাছের সকল গুনাবলী বজায় থাকে না, তবে পদ্ধতিটি সহজ। এ পদ্ধতির সুবিধা হলো  বীজের মাধ্যমে রোগ-পোকা আক্রমনের সম্ভাবনা কম থাকে ।

     

    (খ) ডিভিশন (Division of clumps)

    মাতৃগাছের ক্লাম্প বিভক্ত করে বংশবৃদ্ধি করা যায়। এজন্য মাঠের সুপ্রতিষ্ঠিত ও পরিপূর্ণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত গাছগুলিকে ছোট ছোট ভাগে ধারালো ছুরি দিয়ে ভাগ করা হয়।

    উক্ত সাকার (Sucker) গুলির পাতা ও শিকড় হালকা প্রুনিং (Pruning) করে পরবর্তীতে নতুন বেডে (Bed) লাগানো হয়।

     

    (গ) মাইক্রোপ্রোপাগেশন (Micropropagation)

    বানিজ্যিক ভাবে চাষাবাদের ক্ষেত্রে উপরের পদ্ধতি দুটি খুব উপযোগী নয়। অল্প সময়ে প্রচুর সংখ্যায় রোগমুক্ত জারবেরার চারা পাওয়ার জন্য টিসুকালচার পদ্ধতিটি উত্তম। এ জন্য প্রথমে সঠিক জাত নির্বাচন করতে হবে। পরে ঐ গাছের কান্ডের বর্ধিত অগ্রাংশ (growing shoot tips), ফুল কুড়ি (Flower bud), পাতা (Leaf) ইত্যাদিকে এক্সপ্লান্ট (Explants) হিসাবে নিয়ে বার বার সাব-কালচার (Sub-culture) করে অসংখ্য চারা উৎপাদন করা সম্ভব।

     

    চাষাবাদ (Cultivation)

    (ক) জমি তৈরী (Land preparation)

    জমিতে পরিমানমত জৈব সার দিতে হবে। তারপর ৪০-৪৫ সেঃ মিঃ গভীর করে আড়াআড়ি ও লম্বা ভাবে পরপর কয়েকটি চাষ দিয়ে জমিটি ঝুরঝুরা (fine tilth) করে তৈরী করতে হবে। ফলে সকল জৈব সার মাটির সাথে সুন্দরভাবে মিশে যাবে

     

    (খ) বেড তৈরী (Bed preparation)

    জারবেরার জন্য বেডের উচ্চতা ২০ সেঃ মিঃ এবং প্রশস্ততা ১.০-১.২ মিঃ হলে ভাল হয়। জমিতে যেন পানি জমে না থাকে সেজন্য দুই বেডের মধ্যবর্তী ৫০ সেঃ মিঃ পানি নিষ্কাশন নালা থাকতে হবে। সাধারনতঃ একবার লাগিয়ে পর্যায়ক্রমে ২ বৎসর ফুল আহরন করা হয় বলে জমি ও বেড তৈরীর সময়   সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হয়।

     

    (গ) চারা লাগানো (Planting)

    বেড (Bed) তৈরী হলে জাত ও এর বৃদ্ধির ধরন বুঝে সাকারগুলি (Sucker) সারি থেকে সারি ৫০ সেমি এবং গাছ থেকে গাছ ৪০ সেমি দূরত্ব রেখে রোপন করতে হবে। চারাগুলি এমনভাবে মাটিতে স্থাপন করতে হবে যেন চারার ক্রাউন (Crown or Central growing point) মাটির (Surface level) উপরে থাকে । ক্রাউন মাটির নীচে গেলে গোড়া পচা (Foot rot) রোগ সংক্রমনের সমূহ সম্ভাবনা থেকে যায়।

     

    (ঘ) লাগানোর সময় (Planting time)

    জারবেরা সারা বৎসর লাগানো যায় তবে উন্নত ফুল ও বেশী উৎপাদন পেতে সাধারনতঃ অক্টোবর-নভেম্বর  মাসে চারা লাগানো উচিত।

     

    (ঙ) পানি দেয়া (Irrigation)

    জারবেরার শিকড় গভীরে প্রবেশ করে বিধায় বার বার হালকা স্প্রিংকলার (Sprinkler) সেচের পরিবর্তে প্লাবন সেচ (Flood Irrigation) দেয়া উত্তম। পানি সেচের সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন জলাবদ্ধতার সৃষ্টি না হয়। কারণ জারবেরা ক্ষেতে জলাবদ্ধতা মাটিবাহিত রোগ সংক্রমণ ত¦রানি¦ত করে। আবার মাটিতে পানির অভাব হলে গাছ ঢলে (Wilting) পড়ে, সেক্ষেত্রে ফুলের পুষ্পদন্ড ছোট হয়ে যায়। বায়ু চলাচলের সুবিধার জন্য প্রতিবার সেচ দেয়ার পর মাটিতে জো  আসলে নিড়ানী দিয়ে উপরের শক্ত আস্তরণ (Hard crust)  ভেঙ্গে দিতে হবে।

     

    (চ) সারপ্রয়োগ (Fertilization)

    জারবেরা দ্রুত বর্ধনশীল একটি ফুল ফসল।

    গাছের বৃদ্ধি নিশ্চিতকরণ ও গাছ থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদন পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়ে পরিমিত পরিমান সার প্রয়োগ করতে হবে। চারা লাগানোর পর নতুন শিকড় গজানো শুরু হলে সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে।

    প্রতি হেক্টরে ১০ টন পঁচা গোবর/কম্পোস্ট, ২ টন কোকোডাষ্ট, ৩৫০ কেজি ইউরিয়া, ২৫০ কেজি টিএসপি ও ৩০০ কেজি মিউরেট অব পটাশ, ১৬৫ কেজি জিপসাম, ১২ কেজি বোরিক এসিড ও জিংক অক্সাইড সার প্রয়োগ করতে হবে। সাকার রোপণের ১০-১৫ দিন পূর্বে পঁচা গোবর/কম্পোস্ট এবং ইউরিয়া বাদে অন্যান্য সার ৭-১০ দিন পূর্বে মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। সাকার রোপণের ২৫ দিন পর ইউরিয়া সারের অর্ধেক প্রয়োগ করতে হবে এবং বাকি অর্ধেক সার সাকার রোপণের ৪৫ দিন পর গাছের গোড়ার চারপাশে একটু দূর দিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। উপরি প্রয়োগের পর সেচ দিতে  হবে।

     

    রোগ ও পোকা মাকড় ব্যবস্থাপনাঃ

     

    মুল পচা রোগঃ

    মাটি বাহিত এক প্রকার ছত্রাকের আক্রমণে এরোগ হয়। এরোগে আক্রান্ত হলে  গাছের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়এবং অবশেষে সম্পূর্ণ গাছটি শুকিয়ে যায়। মাটি জীবাণুমুক্ত করে চারা লাগালে এরোগ কম হয়।

     

    গোড়া পঁচা রোগঃ

    এটি মাটি বাহিত রোগ। এ রোগের ফলে গাছের কেন্দ্রীয় অংশ প্রথমে কালো রং ধারণ করে ও পরে পচে যায়। পরবর্তীতে পাতা ও ফুল মারা যায়।

     

    প্রতিকারঃ

    ১. রিডোমিল অথবা ডায়থেন এম-৪৫ ছত্রাকনাশক ০.২% হারে ৭-১০ দিন অন্তর স্প্রে করলে ভাল ফল পাওয়া যায়।

    ২. টপসিন ০.০৫% হারে ৭-১০ দিন অন্তর স্প্রে করেও এরোগ দমন করা যায়।

     

    পাউডারি মিলডিউঃ

    দুই ধরনের ছত্রাকের আক্রমণে এরোগ হয়। এরোগে আক্রান্ত গাছেরর উপরে  সাদা পাউডারের আস্তরণ দেয়া হয়েছে বলে মনে হয়।

    প্রতিকারঃ

    ১। বেনোমিল ৫০ডব্লিউপি  ০.০১% হারে সেপ্র করলে ভাল ফল পাওয়া  যায়।

     

    পোকামাকড়ঃ

    মাকড়ঃ

    শুস্ক ও উষ্ণ আবহাওয়ায় মাকড়ের আক্রমণ দেখা যায়। এর আক্রমণে পাতা ও ফুলকুঁড়ির বৃদ্ধি চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। ফুলের অস্বাভাবিক আকার ও আকৃতির কারণে বাজার মুল্য থাকেনা।

     

    প্রতিকারঃ 

    ১. আক্রমনের প্রথম দিকে আক্রান্ত পাতা সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।

    ২. যে কোন মাকড় নাশক যেমন ভারটিম্যাক বা ওমাইট ৫৭ইসি ১.৫ মিঃলিঃ প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে গাছে স্প্রে করতে

    হবে।

     

    সাদা মাছি পোকা ঃ

    সাদা মাছি গাছের বিভিন্ন অংশের রস চুষে মারাত্মক ক্ষতি করে। এ পোকা ভাইরাস রোগ ছড়ায়।

     

    দমনঃ

    ১. আঁঠালো হলুদ রংয়ের ফাঁদ ব্যবহার করা ।

    ২.  ৫০ গ্রাম আধা ভাঙা নিমবীজ ১ লিটার পানিতে ১২ ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে উক্ত পানি ছেকে ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার পাতার নীচের দিকে স্প্রে করা।

    ৩.  চারা রোপনের ১০-১৫ দিন পর থেকে এসাটাপ ৭৫ (এসপি) ও কুমুলাস ডিএফ এক সঙ্গে ২ গ্রাম করে প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০-১২ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।

     

    ফুল তোলা (Harvesting)

    পূর্ন বিকশিত জারবেরা ফুলের বাহিরের দু’সারি ডিস্ক ফ্লোরেট (Disc floret) পুষ্প দন্ডের সাথে সমকৌনিক অবস্থানে আসলে ফুল তোলা হয়। কর্তনের সময় পুষ্পদন্ড যথাসম্ভব লম্বা রেখে ফুল সংগ্রহ করা হয়। ধারালো চাকু দ্বারা তেরছা ভাবে খুব সকালে বা বিকালে ফুল তোলা উত্তম। ফুল কাটার পর পুষ্পদন্ড এক ইঞ্চি  পানিতে ডুবিয়ে রাখতে হবে। পানির সাথে অল্প চিনি এবং কয়েক ফোটা লেবুর রস মিশিয়ে দিলে ফুল সতেজ থাকে।

     

    ফলন (Yield)

    জাত ভেদে ফলন কম বেশি হয়। তবে প্রতি গাছে ২০-২৫ টি ফুল বছরে সংগ্রহ করা যায়।


    রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক গবেষক মতিউর রহমান রাজশাহীর আকাফুজি ল্যাবে দেশে সাশ্রয়ী মূল্যে টিস্যু কালচারের চারা উৎপাদনে মনোনিবেশ করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. এম মনজুর হোসেনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে তিনি গবেষণায় সফল হন। এই চারার প্রতিটির দাম পড়ছে ৩০ টাকা করে। গবেষক মতিউর রহমান জানানজারবেরা ফুলের বীজ থেকে চারা হয় না। মূলগাছের সাকার থেকে যে চারা হয় তার ফুলের উৎপাদন কম। মানসম্পন্নও নয়। এ কারণে বংশবৃদ্ধির জন্য টিস্যু কালচার প্রয়োজন। এই পদ্ধতিতে একসাথে অল্প সময়ে জীবাণুমুক্ত অধিক চারা পাওয়া যায়।




    এই ফুলটি বহুবর্ষজীবী হওয়ায় একবার চারা রোপণ করলে বহু বছর ফুল পাওয়া যায়। তবে প্রতি বছর নতুন চারা লাগালে উৎপাদন বেশি হয়। হাফিজুর রহমান পিন্টু জানানফুল ফোটার পর গাছে ৩০ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত সতেজ থাকে। আর তোলার পর সতেজ থাকে আট থেকে ১৫ দিন। এই ফুলের চাষ বৃদ্ধির লক্ষ্যে গোল্ডেন সিড ফার্ম ফুলচাষিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। এ জন্য চার কাঠা জমিতে একটি প্রদর্শনী খামার করা হয়েছে। এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে গদখালির ফুলচাষিরা টিস্যু কালচারের মাধ্যমে জারবেরার চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। জারবেরা চাষে লাভের কথা স্বীকার করে গদখালি ফুলচাষি কল্যাণ সমিতির সভাপতি আবদুর রহিম বলেনএখানকার চাষিরা এই লাভজনক ফুল চাষের প্রতি ঝুঁকছেন। সমিতিভুক্ত চাষিরা এবার ১৫ একরে জারবেরার চাষ করেছেন।  জারবেরা সূর্যমুখী প্রজাতির। ফুল দেখতে সূর্যমুখীর মতোই। এর নান্দনিক সৌন্দর্য ফুলের জগতে এক আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। বাংলাদেশে ৯ রঙের জারবেরার জাত আছে। এর মধ্যে লালসাদাহলুদপিংকমেজেন্ডা ও কমলা উল্লেখযোগ্য। যশোর জেলার মাটির পিএইচ (অম্লত্ব ও ক্ষারত্ব নির্দেশক) ৬ দশমিক ৫ থেকে ৭ দশমিক ৫ হওয়ায় জারবেরা চাষের উপযোগী। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ও জুন-জুলাই জারবেরা চাষের উপযুক্ত সময়।  কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক হেমায়েত হোসেন জানানটিস্যু কালচারের মাধ্যমে জারবেরা চাষ করলে ফুলচাষিরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।

    Wednesday, May 10, 2017

    ছাদ/ব্যালকনির উপযোগী ফুল মর্নিং গ্লোরী

  • Share The Gag
  • ছাদ/ব্যালকনির উপযোগী ফুল মর্নিং গ্লোরী

    অদ্ভুত এক সুন্দর ফুলের নাম মর্নিং গ্লোরী । নামটাও বেশ চমৎকার । অপরূপ সুন্দর ফুলটি যখন ছাদ বা ব্যালকনিতে ফুটে তখন সবার নজর কাড়ে। মর্নিং গ্লোরীর অনেক প্রজাতি রয়েছে। প্রায় এক হাজার প্রজাতির মর্নিং গ্লোরী পাওয়া যায় বিশ্বের নানা প্রান্তে। তাদের নানা রঙ, নানা রূপ।মর্নিং গ্লোরী মূলত মেক্সিকো ও সেন্ট্রাল আমেরিকার অধিবাসী। প্রায় সব ধরনের মর্নিং গ্লোরির বৈশিষ্ট্য একই রকম। লতানো গাছ, পানপাতা আকৃতির পাতা এবং ফুল ফানেল আকৃতির। নীল, উজ্জ্বল লাল, সাদা, গাঢ় বেগুনি, গোলাপিসহ নানা রঙের মর্নিং গ্লোরী দেখা যায় । তবে আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় গাঢ় বেগুনি, গোলাপি ও আকাশি নীল রঙগুলো। ফুল সকালে ফোটে এবং দুপুরে নেতিয়ে যায়। মর্নিং গ্লোরীর চারা হয় বীজ থেকে। টবেই লাগানো সম্ভব এটি। বছরের যেকোনো সময়ই এ ফুলের চারা রোপণ বা বীজ বপন করা যায়। তবে অন্য গাছের মতোই বর্ষাকাল মর্নিং গ্লোরী লাগানোর জন্য উপযুক্ত । চারাগুলোকে তার বা অন্যকিছু দিয়ে উপরে লতানোর বন্দোবস্ত করে দিতে হয় । বারান্দায় টবে লাগালে গ্রিলেও লতানো যায় ।

    Tuesday, March 29, 2016

    প্রথমবারের মত আয়োজন করা হলো “বাংলাদেশ ফ্লাওয়ারস ফেস্টিভাল ২০১৬” ইং

  • Share The Gag
  • দেশে প্রথমবারের মত আয়োজন করা হলো “বাংলাদেশ ফ্লাওয়ারস ফেস্টিভাল ২০১৬” ইং

    20160329_174058

    বাংলাদেশ ফ্লাওয়ারস সোসাইটি (বিএফএস) কর্তৃক আয়োজনে  ইউ এস এইড এর আর্থিক সহযোগিতায় বাংলাদেশে প্রথমবারের মত উদযাপিত হলো হলো বাংলাদেশ ফ্লাওয়ারস ফেস্টিভাল ২০১৬ ইং। অনুষ্ঠানটির উদ্ভোদন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় কৃষি মন্ত্রী বেগম মতিয়া চোধুরী -এম পি।

    20160329_175108

    আজ ২৯ মার্চ থেকে শুরু করে ৩০ মার্চ পর্যন্ত থাকবে এই ফেস্টিভাল টি। নানা আয়োজনে উদযাপিত হবে এই ফেস্টিভাল বিশেষ আকর্ষন হিসাবে আজ হচ্ছে ফ্যাশন সো। দেশে খাদ্য চাহিদার স্বয়ং সম্পূর্নতার আসার পাশাপাশি এখন দেশে কৃষিতে অন্তর্ভুক্ত করা হোক ফুল কে এমন টাই আয়োজকদের প্রস্তাবনা এছাড়াও তুলে ধরা হয় আগামীতে বাংলাদেশে ফুল চাষের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। এই ফেস্টিভাল থেকেই যাত্রা শুরু করলো দেশের প্রথম ফুল বিক্রির অনলাইন শপ - deshiphool.com আর এই ওয়েবসাইটি আজকে থেকে সবার জন্য উম্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে যে কেউ চাইলেই অনলাইনে কিনতে পাড়বে ফুল।   

    Sunday, February 14, 2016

    চন্দ্রমল্লিকা চাষ পদ্ধতি

  • Share The Gag
  • শীতকালীন মৌসুমি ফুলের মধ্যে চন্দ্রমল্লিকা রুপে ও সৌন্দর্যে গোলাপের মতই জনপ্রীয়। খ্রিস্টমাসের সময় এ ফুল ফোটে বলে একে ক্রিসেন্থিমাম বলা হয়। জাপান ও চীনদেশই সম্ভবত চন্দ্রমল্লিকার আদি জন্মস্থান। এ ফুল নানা বনের্র ও নানান রঙ এর হয়ে থাকে। নানা রঙ  এর বাহার ও গঠনের জন্য একে শরৎ রানী বলা হয়। বাড়ির উঠান, বারান্দা, ছাদ ইত্যাদি সাজাবার জন্য চন্দ্রমল্লিকা সাধারনত ব্যবহৃত হয়।

    জাতঃ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট থেকে উদ্ভাবিত জাতগুলো হলো-


    • বারি চন্দ্রমল্লিকা-১: এ জাতটি দেশের সবখানে চাষ করা যায়। প্রতিটি গাছে ৩০-৩৫টি ফুল উৎপাদিত হয়। ফুলের সজীবতা ৯-১০ দিন থাকে। ফুলের রং হলুদ।

    • বারি চন্দ্রমল্লিকা-২: সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। ২০-২৫ দিনের চারা মাঠে বা পটে লাগানো হয়। গাছ প্রতি গড়ে ৩৫-৪০টি ফুল ধরে। ফুলের সজীবতা ১২-১৪ দিন থাকে। ফুলের রং সাদা।


    রোপণ সময়ঃ জমি অথবা টবে চারা রোপণের উপযুক্ত সময় অক্টোবর থেকে নভেম্বর।

    চন্দ্রমল্লিকা চাষ পদ্ধতিঃ চন্দ্রমল্লিকা ফুল চাষের জন্য উর্বর হালকা দোআঁশ মাটি, উচু, শুষ্ক ও সহজে জল নিস্কাশিত হয় এমন জমি প্রয়োজন। দক্ষিণ খোলা জমি চন্দ্রমল্লিকা ফুল চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। জমিতে লাঙ্গল দেওয়া বা কোপানোর সময় জমিতে পরিমাণমতো পাতাপচা সার, পচা গোবর সার, হাড়গুড়া বা সুপার ফসফেট সার প্রয়োগ করে জমির সাথে মিশাতে হবে। জমিকে উত্তমরুপে কর্ষণ করে মাটি ঝুরঙুরে ও নরম করিয়া ১ ফুট বা ৩০ সেমি. দুরে দুরে চারা বসাতে হবে। চারা রোপণের পর জমিতে উপযুক্ত পরিমাণে ও নিয়মিতভাবে সেচ প্রদান করতে হবে।

    চন্দ্রমল্লিকার পরিচর্যাঃ

    পানি সেচঃ চন্দ্রমল্লিকার চারা বিকেলে রোপণ করে গোড়ার মাটি চেপে দিতে হবে। চারা লাগানোর পর হালকা সেচ দিতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন গোড়ায় বেশি পানি জমে না যায়। চারা রোপণের পর নিয়মিতভাবে পরিমানমতো সেচ দিতে হবে।

    সার প্রয়োগঃ





































    সারের নাম

    পরিমান (প্রতি হেক্টরে=২৪৭ শতকে) (কেজিতে)

    পচা গোবর/কম্পোস্ট

    ১০০০০

    ইউরিয়া

    ৪০০

    টিএসপি

    ২৭৫

    এমওপি

    ৩০০

    জিপসাম

    ১৬৫

    বোরিক এসিড

    ১২

    দস্তা


    বেসাল সার সাকার রোপণের ৭-১০ দিন আগে এবং গোবর/কম্পোষ্ট অন্তত ১০-১৫ দিন আগে মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। রোপণের প্রায় ২৫-৩০ দিন পরে ইউরিয়া সারের অর্ধেক প্রয়োগ করতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া সার রোপণের ৪৫-৫০ দিন পর গাছের গোড়ায় চারপাশে একটু দূর দিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। উপরি প্রয়োগের পর সার মাটির সাথে মিশিয়ে সেচ প্রদান করতে হবে।

    আগাছা পরিস্কারঃ বাগানের এবং টবের চন্দ্রমল্লিকা গাছের গোড়ার মাটি নিয়মিত খুড়ে আলগা করতে হবে এবং ঘাস আগাছা ইত্যাদি তুলে ফেলতে হবে।

    খুটি দিয়ে ঠেকঃ দ্রুত গাছ বৃদ্ধি ও ঝোড়ো বাতাস থেকে গাছকে রক্ষার জন্য গাছের পাশে শক্ত কাঠি পুঁতে গাছের সঙ্গে আলতোভাবে বেধে দিতে হয়।

    ডাল ছাটাইঃ চন্দ্র মল্লিকা একটি বা একাধিক ফুল নিয়ে ফুটতে পারে। যিনি একাধিক ফুল ফোটাতে চান তিনি শ্রাবণের মাঝামাঝি থেকেই ছাঁটাই শুরু করবেন। এটা গাছের এমন সময় করতে হবে যখন গাছের উপর দিকের পাতার কোণ থেকে ডাল বেরোনোর আভাস দেখা যাবে। এতে ফুল তাড়াতাড়ি ও ভাল হয়। একটি বড় ফুল পেতে হলে আগার মুকুল রেখে অন্য মুকুল ও ডালপালা ভেঙ্গে দিতে হয়।

    ডগা মোটা হলেঃ নাইট্রোজেন সারের মাত্রা বেশি হয়ে গেলে গাছের ডগা মোটা হয়ে যায় এবং ফুল ফোটে না। এক্ষেত্রে টবের মাটি শুকিয়ে নিয়ে মাঝে মাঝে চুনের পানি ব্যবহার করতে হয়।

    বড় ফুল পাবার উপায়ঃ চারা লাগানোর মাস খানেক পর গাছের অগ্রভাগ কেটে দিতে হবে। এতে করে গাছ লম্বা না হয়ে ঝোপালো হয়। চারা গাছে তাড়াতাড়ি ফুল আসলে তা সাথে সাথে অপসারণ করতে হবে। বড় আকারের ফুল পেতে হলে ‘‘ডিসবাডিং’’ অর্থাৎ মধ্যের কুঁড়িটি রেখে পাশের দুটি কুঁড়ি কেটে ফেলতে হবে। আর মধ্যম আকারের ফুল পেতে চাইলে মাঝের কুঁড়িটি অপসারণ করা উচিত।

    রোগ ও পোকামাকড় দমনঃ

    পাউডারী মিলডিও রোগ দমনঃ এ রোগ হলে গাছের পাতা ধূসর রঙ ধারণ করে। পাতার উপরে সাদা সাদা পাউডার দেখা যায়। টিল্ট ২৫০ ইসি ২ মিলিলিটার বা ২ গ্রাম থিওভিট প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।

    জাব পোকা দমনঃ জাব পোকা ফুলের প্রধান ক্ষতিকারক পোকা। জাব পোকা গাঢ় সবুচ, বেগুণী বা কালো রঙের হয়। অপ্রাপ্ত বয়স্ক এবং প্রাপ্ত বয়স্ক উভয় অবস্থাতেই গাছের নতুন ডগা বা ফুলের রস চুষে খায় এবং গাছের বৃদ্ধি ও ফলনে মারাত্মক ক্ষতি করে। নোভাক্রন (০.১%) বা রগর (১%) প্রয়োগ করে এ পোকা দমন করা যায়।

    শোষক পোকা দমনঃ শোষক পোক খুবই ছোট আকারের পোকা। ছাই রঙের এই পোকাকে খালি চোখে দেখা যায় না। এ পেকা পাতা ও ফুলের রস শোষণ করে। পাতা ও ফুল ষুকিয়ে যায় এবং আক্রমণ বেশি হলে গাছও শুকিয়ে যায়। এ পোকা দমুনের জন্য ২ মিলিলিটার ম্যালাথিয়ন ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।

    ফুল সংগ্রহঃ চন্দ্রমল্লিকা ফুল কুঁড়ি অবস্থায় তুললে ফোটে না। বাইরের পাঁপড়িগুলো সম্পূর্ণ খুলে গেছে এবং মাঝের পাঁপড়িগুলো ফুটতে শুরু করেছে এমন অবস্থায় ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে খুব সকালে অথবা বিকেলে দীর্ঘ বোঁটাসহ ফুল তোলা উচিত।

    ফলনঃ জাতভেদে ফলন কম বেশি হয়। তবে প্রতি গাছে বছরে গড়ে ৩০-৪০টি ফুল পাওয়া যায়।

    গাঁদা ফুল চাষ পদ্ধতি

  • Share The Gag
  • গাঁদা একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত ফুল। সাধারণত: এটি শীতকালীন ফুল হলেও বর্তমানে এটি গ্রীষ্ম এবং বর্ষাকালেও চাষাবাদ হয়ে থাকে। গাঁদা ফুল বিভিন্ন জাত ও রঙের দেখা যায়। বাগানের শোভা বর্ধন ছাড়াও বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান, পূজা-পার্বন ও গৃহসজ্জায় এর ব্যাপক ব্যবহার ফুলটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।




    গুণাগুণঃ ক্ষত ও আঘাতে এর পাতার রস অত্যন্ত কার্যকরী। পাতার রস কান পাকা রোগ ছাড়াও ছত্রাকনাশক হিসেবে বেশ কার্যকরী। গাঁদা ফুলের নির্যাস টিউমারের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে। গাঁদা ফুলের নির্যাস ক্যান্সারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। জমিতে গাঁদা গাছের শুকনা গুড়া বা অপ্রয়োজনীয় অংশ প্রয়োগ করে নেমাটোডের মতো মারাত্মক রোগের উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। বিভিন্ন ধরনের তেল ও সুগন্ধী তৈরিতে গাঁদা ফুল ব্যবহৃত হয়।




    যেসব এলাকায় বেশি পরিমাণে চাষ হয়ঃ যশোরের গদখালী, ঝিকরগাছা, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, গাজীপুর জেলার সদর উপজেলা, চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী ও পটিয়া, ঢাকা জেলার সাভার এলাকায় বাণিজ্যিকভিত্তিতে গাঁদা ফুলের চাষাবাদ হচ্ছে।




    জাতঃ বহু প্রজাতি থাকলেও গাঁদা ফুলের জাতকে প্রধানত: দু’ভাগে ভাগ করা যায় ।



    • আফ্রিকান গাঁদা-ইনকা, গিনি গোল্ড, ইয়েলা সুপ্রিম, গোল্ডস্মিথ, ম্যান ইন দি মুন, ইত্যাদি;

    • ফরাসী গাঁদা-মেরিয়েটা, হারমনি, লিজন অব অনার, ইত্যাদি।



    এছাড়াও বাংলাদেশে সাদা গাঁদা, জাম্বো গাঁদা এবং রক্ত বা চাইনিজ গাঁদার চাষ হয়ে থাকে।




    গাছের বৃদ্ধি ও ফুল উৎপাদনঃ গাঁদা গাছের বৃদ্ধি ও ফুল ফোটা প্রধানত: দিনের দৈর্ঘ্য ও তাপমাত্রার উপর নির্ভর করে। পরিমাণমতো মাটির রস ও পুষ্টি উপাদানও গাছের বৃদ্ধি ও ফুল ফোটার জন্য প্রয়োজন। দিনের দৈর্ঘ্য বেশি হলে এবং স্বল্প তাপমাত্রায় (১২ থেকে ২১ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড) আফ্রিকান গাঁদা ভালোভাবে ফোটে এবং এর জীবনকালও বেশি হয়।




    মাটি ও পরিবেশঃ এঁটেল দো-আঁশ মাটি বেশি উপযোগী, তবে যত্নসহ চাষ করলে যে কোন ধরণের মাটিতেই চাষ করা যেতে পারে। পানি জমে না এমন উর্বর অমস্ন (পি এইচ ৭.০ হতে ৭.৫) মাটি গাঁদা চাষের জন্য ভাল। ফরাসী গাঁদা খুবই নিকৃষ্ট মাটিতে ভাল হলেও আফ্রিকান গাঁদা চাষের জন্য পর্যাপ্ত সার দিতে হবে। জমিতে যেন পানি জমে না থাকে এবং জমিতে যাতে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পড়ে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। গাঁদা চাষের জন্য মৃদু আবহাওয়া প্রয়োজন।




    বংশ বিস্তারঃ গাঁদা ফুলের বংশ বিস্তার বীজ বা কাটিংয়ের মাধ্যমে করা যায়। বীজ থেকে যে গাছ হয় তা স্বাস্থ্যবান, লম্বা ও অধিক ফলনশীল হয় বলে সাধারণত: বীজের মাধ্যমেই বংশ বিস্তার করা হয়। তবে জাতের বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে হলে অবশ্যই কাটিং বা অঙ্গজ উপায়ে বংশ বিস্তারই সহজ ও ভাল।




    চারা উৎপাদনঃ সাধারণত: দু’ভাবে গাঁদা ফুলের চারা উৎপাদন করা যায়-



    • বীজের মাধ্যমেঃ বীজের মাধ্যমে চারা উৎপাদনের জন্য বীজতলার মাটি ভালোভাবে ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। বীজতলায় নিয়মিত পানি দিতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে বীজতলায় যেন পানি জমে না থাকে। চারাগুলো ১.৫ ইঞ্চি থেকে ২ ইঞ্চি লম্বা হলে আগা কেটে দিলে চারা অতিরিক্ত লম্বা হয় না এবং সবল থাকে। এক মাস বয়স হলে চারাগুলো মূল জমিতে রোপণ করা যাবে।

    • কাটিংয়ের মাধ্যমেঃ ফুল দেওয়া শেষ হলে সবল ও সুস্থ গাছ নির্বাচন করে তা থেকে ৪ থেকে ৫ ইঞ্চি লম্বা ডাল কেটে নিতে হবে।  কাটিংগুলো পরে ছায়াযুক্ত স্থানে বালি ও মাটির মিশ্রণে ১ থেকে ১.৫ ইঞ্চি গভীরে রোপণ করতে হবে এবং নিয়মিত পানি সেচ দিতে হবে। এতে কাটিংয়ে খুব তাড়াতাড়ি শিকড় গজাবে। পরে গাছগুলো টবে বা জমিতে লাগাতে হবে।





    চারা রোপণঃ কাটিং বা বীজ থেকে প্রাপ্ত চারা বর্ষার শেষে মূল জমিতে বা টবে রোপণ করতে হবে। ৩ থেকে ৪ পাতা বিশিষ্ট সবল চারা রোপণের জন্য ভাল। বিকালে যখন রোদের তাপ কমে যাবে তখন জমিতে চারা রোপণ করতে হবে। সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ২ হাত এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব হবে ৬ ইঞ্চি। চারাগুলো লাগানোর আগে পাত্রে পানি নিযে দুই চা চামচ ডায়াথেন- এম ৪৫ ওষুধ মিশিয়ে চারাগুলো ঐ পানিতে ভিজিয়ে ৫ থেকে ৬ মিনিট পর তুলে লাগালে চারার মৃত্যুহার অনেক কম হবে।




    ফুল উৎপাদনঃ গাঁদা ফুল সারা বছরে তিনবার উৎপাদন করা যায়।


























    ফুল দেয়ার সময়

    বপন সময়

    চারা রোপণ সময়

    বর্ষাকাল

    জুনের মাঝামাঝি

    জুলাই এর মাঝামাঝি

    শীতকাল

    সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি

    অক্টোবরের মাঝামাঝি

    গ্রীষ্মকাল

    জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি

    ফেব্রুয়ারি-মার্চ


    সার প্রয়োগ


































    সারের নাম

    পরিমাণ (একর প্রতি)

    পচা গোবর

    ১৫০০০ থেকে ২০০০০

    ইউরিয়া

    ১০০ কেজি

    টিএসপি

    ৮০ কেজি

    এমওপি

    ৬০ কেজি

    জিপসাম

    ৪০ কেজি

    দস্তা

    ৩ কেজি






    বিঃদ্রঃ চারা রোপণের ৩০ থেকে ৪৫ দিন পর একরপ্রতি ৭০ কেজি ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে।






    চাষের সময়ে পরিচর্যাঃ চারা লাগানোর ৮ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত কোন কিছু করতে হবে না। জমিতে বা বীজতলায় চারা লাগানোর পর আগাছা বেশি হয়, গাঁদা ফুলের জমিতে নিড়ানি দিয়ে সমসত্ম জমি কুপিয়ে দিতে হবে, তারপর প্রতি একরে ৬০ কেজি হাওে ডিএমপি সার শুধু গাছের সারির মধ্যে ছিটিয়ে দিয়ে সেচ দিতে হবে। সেচ দেওয়ার পর যে চারা গুলো মারা যাবে, সেই জায়গায় অন্য জায়গা থেকে চারা  এনে পূরণ করতে হবে। চারা যখন বড় হবে তখন গাছের গোড়ায় মাটি দিতে হবে। গাঁদার জন্য অপেক্ষাকৃত কম সেচের প্রয়োজন, তবে ফুল আসার পর সেচ দিলে ফুল বড় হয় এবং ফুলের রং ভালো হয়। জমিতে সেচ সাধারণত: খুব ভোরে অথবা সন্ধ্যার আগে দিতে হবে, প্রচন্ড রোদে জমিতে সেচ দেওয়া যাবে কারণ এত চারার ক্ষতি হয়। গাছে বেশি ফুল পেতে চাইলে ‘‘স্টপিং পদ্ধতিতে’’ গাছের ডগা কেটে দিতে হবে। এতে গাছে ডালপালা ও বেশি ফুল হবে। বড় আকারের ফুল পেতে হলে একটি বা দু’টি কুঁড়ি রেখে বাকি গুলো ফেলে দিতে হবে, ফুল বেশি বড় হলে গাছে খুঁটি দিতে হবে। চারা অবস্থায় ‘ডায়থেন এম-৪৫’ এবং ‘রোভরাল’ এই দুই প্রকার ওষুধ অনুমোদিত মাত্রায় স্প্রে করলে রোগ ও পোকার আক্রমণ কম হবে। গাছের তাড়াতাড়ি বুদ্ধিও জন্য থিওভিট ১০ লিটার পানিতে ২ চা চামচ মিশিয়ে স্প্রে করা যেতে পারে, গাছে কুঁড়ি আসলে থিওভিট দেওয়া বন্ধ করতে হবে। যে ফুল ফোটে না অর্থ্যাৎ পাঁপড়ি হয় না, সেই সমসত্ম পুরুষ গাছ তুলে ফেলতে হবে।




    স্টপিং পদ্ধতিঃ রোপণ করা চারা বাড়তে থাকলে ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি উপরে মাথা কেটে দিতে হবে। পরে যে ডাল বের হবে, তার মধ্য থেকে ২ থেকে ৩ টি ডাল রেখে তাতে ফুল ফোটাতে হবে। এবং গাছকে যতটুকু পারা যায় খাটো রাখতে হবে। এটাই স্টপিং পদ্ধতি বলে।




    পোকামাকড় ও রোগবালাইঃ গাঁদা গাছ অনেক পোকা-মাকড়ের বিরুদ্ধেই প্রতিরোধী হিসেবে কাজ করে বলে এতে পোকার উপদ্রব নেই বললেই চলে। তবে এতে কিছু রোগের আক্রমণ দেখা যায়, যেমন-উইল্ট, কান্ড পচা ইত্যাদি।


    রোগবালাই




    গাঁদা ফুলের গোড়া পচা রোগঃ ছত্রাকের আক্রমণে এই রোগ হয়। জলাবদ্ধ জমির গাঁদা ফুলের গাছে গোড়া পচা রোগ বেশি দেখা যায়। গাছের শিকড়ে পচন ধরে। গাছ নেতিয়ে পড়ে ও মরে যায়।




    ব্যবস্থাপনাঃ জমির পানি বের করে দেওয়ার ভাল ব্যবস্থা করতে হবে এবং জমিতে সেচ দেওয়া বন্ধ করে দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে গাছের গোড়ায় যেন কোন মতেই পানি জমে না থাকে। রোগাক্রান্ত গাছ সমূলে তুলে তা ধ্বংস করতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে টিল্ট বা অনুমোদিত অন্য ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে।




    গাঁদা ফুলের কান্ড পচা রোগঃ ছত্রাকের আক্রমণে এই রোগ হয়। প্রথমে কান্ডে পানি ভেজা দাগ পড়ে। পরে দাগগুলি একত্রিত হয়ে গাছের কান্ডে পচন দেখা দেয়। গাছে পানি ও খাদ্য চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়, ফলে রোগাক্রান্ত গাছ ঝিমিয়ে পড়ে ও শুকিয়ে মারা যায়।




    ব্যবস্থাপনাঃ ছত্রাকের বৃদ্ধি রোধ করার জন্য জমিতে ভাসিয়ে (পস্নাবন) সেচ দেওয়া যাবে না। চাষের আগে টবে বা বাগানে চারা রোপণের আগে মাটিতে ভালোভাবে রোদ খাওয়াতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে টিল্ট বা অনুমোদিত অন্য ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে।




    পোকামাকড়ঃ গাঁদা ফুলের পোকার আক্রমণ নেই বললেই চলে। গাঁদা গাছ অনেক পোকামাকড়ের বিরুদ্ধেই প্রতিরোধী হিসাবে কাজ করে। অনেক সময় গাঁদা ফুলের জমিতে শামুকের উপদ্রব হয়। দেখা মাত্রই শামুক তুলের ফেলতে হবে এবং জমিতে চুন ছিটিয়ে শামুক দমন করতে হবে।




    ফুল সংগ্রহঃ ফুল আকারে বড় হলে একটু লম্বা বোঁটা রেখে কাঁচি দিয়ে ফুল কাটাতে হবে। এতে ফুল বেশিক্ষণ তাজা থাকবে। ফুল সংগ্রহের জন্য ভোর (সকালের রোদ বৃদ্ধি পাওয়ার আগেই ফুল তোরা শেষ করতে হবে) বা বিকালের ঠান্ডা আবহাওয়া ভাল। ফুল সংগ্রহের আগে জমিতে সেচ দিলে সংগ্রহের পর ফুল অনেক বেশি সময় সতেজ থাকবে। সঠিকভাবে যত্ন নিলে ৭০ থেকে ৮০ দিনের মধ্যেই ফুল সংগ্রহ করা যাবে।




    ফলনঃ জাত, রোপণ দূরত্ব, সময়, সার প্রয়োগ প্রভৃতির উপর গাঁদার ফলন নির্ভর করে। ভালভাবে যত্ন নিলে আফ্রিকান গাঁদার একর প্রতি প্রায় ৪ হাজার ৫০০ শত থেকে ৭ হাজার কেজি এবং ফরাসী গাঁদার ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার কেজি পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব।

    গ্লাডিওলাস চাষ পদ্ধতি

  • Share The Gag
  • বিভিন্ন ফুলের মধ্যে ইদানিং গ্লাডিওলাস ফুলটি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আকর্ষণীয় রঙ, গঠন এবং দীর্ঘ সময় এটি সজীব থাকে বলে এই ফুলটি বেশ গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে। বাংলাদেশের যশোর, সাতক্ষীরা, গাজীপুর ও সাভার অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে এই ফুলের চাষ শুরু হয়েছে।

    শ্রেণীবিভাগঃ গ্লাডিওলাসের বহু জাত রয়েছে। এইগুলিকে সাধারণভাবে বৃহদাকার, বড় ফুল, ক্ষুদ্র ফুল এবং প্রজাপতি ইত্যাদি নামে শ্রেণীবিন্যাস করা হয়। এই জাতগুলি আগাম, মাঝারি ও নাবী জাতে ভাগ করা যায়। আবার এগুলোর মধ্যে সিঙ্গেল ও ডাবল জাতও রয়েছে। গ্লাডিওলাস ফুল বিভিন্ন রংয়ের হতে পারে, যেমন-সাদা, হলুদ, গোলাপী, ফিকে লাল, লাল, গাঢ় লাল, কমলা, বেগুনী ইত্যাদি।

    জাতঃ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট গ্লাডিওলাসের কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করেছে। এগুলো হলো-


    • বারি গ্লাডিওলাস-১: ফুলের বোঁটা লম্বা ও বেশি ফ্লোরেটযুক্ত। লাল রঙের দুটি পাঁপড়িতে হলুদ ছোঁপ থাকে। সাধারণত পানিতে ফুলের স্থায়িত্বকাল ৮-৯ দিন।

    • বারি গ্লাডিওলাস-২: লম্বা বোঁটাসম্পন্ন ফুলে গাঢ় মেজেন্টা রঙের অনেকগুলো ফ্লোরেট থাকে। প্রতি ফ্লোরেটের দুটি পাঁপড়িতে ক্রিম রঙের ছোপ দেখা যায় এবং অন্যান্য পাঁপড়িতে সাদা স্ট্রাইপ থাকে। সাধারণত পানিতে ৯ থেকে ১০ দিন তাজা থাকে।

    • বারি গ্লাডিওলাস-৩: সারা বছর চাষ করা যায়। বাজারে চাহিদা আছে। এ জাতের গাছের পাতা তরবারির মতো। কর্ম রোপণের উপযুক্ত সময় মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বর। ফুলের রঙ সাদা। প্রতি হেক্টরে (২৪৭ শতকে) ১.৭৫ থেকে ২.০০ লক্ষ ফুলের স্টিক পাওয়া যায়। ফুলের সজীবতা ৮-৯ দিন থাকে।


    জমি নির্বাচনঃ জৈব সার সমৃদ্ধ, বেলে দো-আঁশ অথবা দো-আঁশ মাটি। উঁচু জমি, যে জমিতে বৃষ্টি অথবা সেচের পানি জমে থাকে না। জমির পিএইচ  মান ৬.৫ থেকে ৭.৫ হওয়া দরকার, তবে এর চাইতে কম পিএইচ সমৃদ্ধ মাটিতেও এই ফুল চাষ করা যেতে পারে। অধিক কাদাযুক্ত এবং কালো মাটির জমিতে চাষ না করাই ভাল। হালকা মাটির ক্ষেত্রে জৈবসার মিশিয়ে মাটির গুণাগুন ভাল করতে হবে। একই জমিতে বারবার গ্লাডিওলাস চাষ করলে মাটি বাহিত রোগের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ফসলও চাষ করতে হবে।

    আবহাওয়াঃ আর্দ্র, রৌদ্র উজ্জল, নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। দিনের তাপমাত্রা ১৫থেকে ২০ সে. থাকলে উৎপাদন ভালো হবে। উপযুক্ত আর্দ্রতা থাকলে ৫০সে. পর্যন্ত তাপমাত্রা গ্লাডিওলাস সহ্য করতে পারে। উচ্চ তাপমাত্রায় গাছের পানি ধরে রাখার ক্ষমতায় সমস্যা দেখা দেয়, তাছাড়া প্রথম বীজ বপন থেকে প্রথম পাতা বের হওয়া পর্যন্ত যদি উচ্চ তাপমাত্রা থাকে তবে গাছ সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রসত্ম হয়। ছোট দিন এবং আলোর তীব্রতা কম হলে ফুল উৎপাদন কমে যায়। পূর্ণ সূর্যালোক এই ফুল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী, ছায়ায় এই ফুল ভাল হয় না। গাছের বৃদ্ধির প্রতিটি ধাপে বিশেষ করে কর্ম (বড় গুঁড়িকন্দ) রোপণ এবং স্পাইক (যে দন্ডটি ফুল ও পাতা ধরে রাখে) বের হওয়ার আগ মুহুর্তে মাটিতে আর্দ্রতার ঘাটতি হলে ফলন কমে যাবে।

    কর্ম (বড় গুঁড়িকন্দ)  ও কর্মেল (ছোট গুঁড়িকন্দ)

    লাগানোর উপযুক্ত সময়ঃ

    কর্ম রোপণঃ অক্টোবর মাসে জমি তৈরির পর ৪.৫-৫.০ সেন্টিমিটার ব্যাসের রোগমুক্ত কর্ম মাটির ৬-৭ সেন্টিমিটার গভীরতায় রোপণ করতে হবে।

    ভাল জাতের বৈশিষ্ট্যঃ

    দেশীয় মাটি ও আবহাওয়ায় চাষ উপযোগী;


    • রোগ বালাই প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন;

    • সহজে গাছ হেলে পড়ে না;

    • উন্নত মানের কর্ম ও কর্মেল ব্যবহার;

    • স্টিকে ফুলের সংখ্যা বেশি থাকা;

    • ফুলের রং অধিকতর উজ্জ্বল হওয়া;

    • বেশি সময় ফুলদানীতে সতেজ থাকা।


    জমি চাষ পদ্ধতিঃ গ্লাডিওলাস ফুলের জন্য জমিকে খুব ভালোভাবে চাষ করতে হয়, এর মূল বেশি গভীরে প্রবেশ করে না, তাই মাটি খুব গভীরভাবে চাষ করার প্রয়োজন নেই। ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি গভীরতায় জমি চাষ করতে হবে, তবে মাটির নীচে শক্ত কাদা মাটির সত্মর থাকলে মাটি আরো গভীরভাবে চাষ করতে হবে। পোকামাকড় মুক্ত রাখতে জমি চাষের সময় ক্লোরডেন এবং মাটি বাহিত রোগ থেকে মুক্ত রাখার জন্য মিথাইল  ব্রোমাইড-ক্লোরোপিকরিন (১৬২কেজি/একর) প্রয়োগ করে মাটি শোধন করতে হবে। এ সময়ে প্রতি একরে প্রায় ১০০০০ কেজি গোবর, ২০ থেকে ২৫ কেজি টিএসপি এবং ১৫ থেকে ২০ কেজি এমওপি সার জমিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।

    রোপণ পদ্ধতিঃ

    কর্ম (মাটির নীচের বড় গুঁড়িকন্দ)-এর ক্ষেত্রেঃ

    রোগমুক্ত বড় (প্রায় ৩০ গ্রাম) ও মাঝারি (প্রায় ২০ গ্রাম) ওজনের ১.৫  থেকে  ২ ইঞ্চি ব্যাস যুক্ত কর্ম ২.৫ থেকে ৩.৫ ইঞ্চি গভীরতায় রোপণ করতে হবে। কর্ম অবশ্যই সুপ্তাবস্থা (যে সময়টুকুতে অঙ্কুর গজাবে না তাকেই সুপ্তাবস্থা বলে) মুক্ত হতে হবে, অর্থাৎ জমির পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। করম লাগানোর পূর্বে অঙ্কুরিত করে ০.১% থেকে ০.৩% ব্যাভিষ্টিন দ্রবনে ৫ মিনিট ভিজিয়ে রেখে বাতাসে শুকিয়ে নিতে হবে, অপরপক্ষে কর্মেল লাগানোর ক্ষেত্রে ২৪ ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে নিতে হবে। উন্নত মানের ফুল পাওয়ার জন্য সারি থেকে সারির দূরত্ব ১২ ইঞ্চি এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ১০ ইঞ্চি হতে হবে। তবে জমির অপচয় রোধ করার জন্য ‘‘১০ ইঞ্চি x ৬ ইঞ্চি’’ দূরত্বে রোপণ করা যেতে পারে।

    কর্মেল (মাটির নীচের বড় গুঁড়িকন্দ)-এর ক্ষেত্রেঃ

    কর্ম এর চারদিকে গুচ্ছাকারে ছোট ছোট কর্মেল পাওয়া যায়, কর্মেলের চারদিকে বাদামী রঙের শক্ত খোসা থাকে যার কারণে অঙ্কুরোদগম হতে দেরী হয়, তাই কর্মেল লাগানোর আগে সাবধানতার সাথে খোসা ছাড়িয়ে ২৪ ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে নিলে অঙ্কুরোদগম তাড়াতাড়ি হবে। কর্মেল লাগানোর ক্ষেত্রে মাটি খুব ঝুরঝুর করে তৈরি করতে হবে এবং কর্ম-এর চেয়ে বেশি পরিমাণে সার প্রয়োগ করতে হবে। প্রতিটি কর্মেল খুব ছোট হওয়ায় রোপণদূরত্ব কমিয়ে ৪ ইঞ্চি x ২ ইঞ্চি দূরত্বে এবং অল্প গভীরতায় (প্রায় ১ থেকে ১.৫ ইঞ্চি) রোপণ করতে হবে।

    সার প্রয়োগঃ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে ভালভাবে চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে জমি তৈরি করতে হয়। শেষ চাষ দেয়ার সময় প্রতি বর্গমিটারে ৫-৬ কেজি গোবর সার, ৩০ গ্রাম টিএসপি এবং ৩০ গ্রাম এমওপি সার মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। গ্লাডিওলাসে বেশি ইউরিয়া সার দেয়া উচিত নয়। কারণ এতে পুষ্পদন্ড বেশি লম্বা ও দূর্বল হয়ে যায়। প্রতি বর্গমিটারে ১০ গ্রাম ইউরিয়া এর অর্ধেক রোপণের ২০-২৫ দিন পর এবং বাকি অর্ধেক পুষ্পদন্ড বের হওয়ার সময় উপরিপ্রয়োগ করা উচিত।

    চাষের সময়ে পরিচর্যা

    (ক) সেচ ও পানি নিস্কাশনঃ ভাল ফুল পাবার জন্য মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে রস থাকতে হবে। কর্ম মাটিতে লাগানোর পর জমিতে হালকা সেচ দিতে হবে, যাতে কর্মগুলি মাটিতে লেগে যেতে পারে। পরবর্তীতে আবহাওয়ার অবস্থা বুঝে ১০ থেকে ১৫ দিন পরপর সেচ দিতে হবে। ঝরণা বা পস্নাবন দুই পদ্ধতিতেই সেচ দেওয়া যায়। মাটিতে পানির পরিমাণ কম থাকলে গাছের বৃদ্ধি কমে যাবে। জমিতে পানির পরিমাণ বেশি হলে কর্ম পচে যেতে পারে।

    (খ) আগাছা দমনঃ গ্লাডিওলাস ফুলের উৎপাদনে নিয়মিতভাবে গভীর শিকড় যুক্ত আগাছা দমন খুবই জরুরী। আগাছানাশক হিসাবে অনুমোদিত আগাছানাশক ১.৮ কেজি/একর স্প্রে করতে হবে। আগাছানাশক ব্যবহারের সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন কর্ম ও কর্মেল ক্ষতিগ্রস্থ না হয়।

    (গ) মালচিং ও মাটি উঠানোঃ গ্লাডিওলাস ফুল চাষের একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পরিচর্যা হচ্ছে গোড়ায় মাটি উঠানো। অঙ্কুরোদগমের পর প্রতি ১৫ থেকে ৩০ দিন পর পর উপরের মাটি খুপরী বা ’’হো’’ দিয়ে মালচিং করে নিতে হবে। গাছে ৩ থেকে ৫ টি পাতা বের হওয়ার পর একবার এবং স্পাইক (৭টি পাতা বের হওয়ার পর) বের হওয়ার সময় গাছের গোড়ায় দুই পাশ থেকে মাটি উঠিয়ে দিতে হবে। সেচ দেওয়ার পর বা কোন কারনে কর্ম বা কর্মেল মাটির উপরে উঠে এলে পাশ থেকে মাটি নিয়ে ঢেকে দিতে হবে। মাটি উঠিয়ে দিলে মাটিতে পর্যাপ্ত রস থাকে এবং বাতাসে গাছ পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।

    (ঘ) স্টেকিং (কাঠি দিয়ে কান্ডকে দাঁড় করিয়ে রাখা): প্রতি সারিতে ৬.৫ ফুট দূরে দূরে বাঁশের/কাঠের কাঠি পুঁতে ৬ ইঞ্চি উপরে একটি এবং স্পাইক বের হওয়ার স্থানে একটি তার বা নাইলনের রশি টানাতে হবে। প্রতি গাছে আলাদা করে ছোট ছোট খুঁটি লাগানো যেতে পারে। গাছ ঘন করে লাগালে স্টেকিং না করলেও চলে। স্টেকিং দেওয়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন কান্ডে বা মাটির নীচে কর্ম বা কর্মেলে আঘাত না লাগে।

    (ঙ) রোগ বালাই, পোকা-মাকড় এবং দমন পদ্ধতি

    শোষক পোকা (থ্রিপস্): এটি অতি ক্ষুদ্র ছাই রঙের পোকা যা খালি চোখে দেখা যায় না। এই পোকা পাতা, স্পাইক ও ফুলের রস শোষণ করে ফলে আক্রান্ত পাতায় রুপালী ও বাদামী রঙের লম্বা দাগ দেখা যায় এবং পাতা ও ফুল শুকিয়ে যায় এবং আক্রমণ বেশী হলে গাছও শুকিয়ে যায়। সংরক্ষিত অবস্থায় কর্মও আক্রান্ত হতে পারে।

    ব্যবস্থাপনাঃ এই পোকা দমন করার জন্য ২০ থেকে ৩০ মিলি ম্যালাথিয়ন ১৮ লিটার পানিতে মিশিয়ে ২ থেকে ৩ বার গাছে স্প্রে করতে হবে। নোভাক্রন (০.১ থেকে ০.১৫%) স্প্রে করেও ভাল ফল পাওয়া যায়।

    জাব পোকা (এফিড): এফিড কচি পাতা, নতুন স্পাইক ও ফুলের রস খায়।

    ব্যবস্থাপনাঃ স্টার্টার/টাফগর ৪০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি হারে স্প্রে করে এই পোকা দমন করা যায়।

    নেমাটোডস/কৃমিঃ বহু ধরণের নেমাটোড গ্লাডিওলাসে আক্রমণ করতে পারে। এদের মধ্যে ‘রুট নট নেমাটোড’ উলেস্নখযোগ্য।

    ব্যবস্থাপনাঃ মাটি শোধন করে এবং নেমাটোড নাশক নিউফরান/ফুরাকার্ব ৩ থেকে ৪ কেজি /একরে ব্যবহার করে নেমাটোডের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

    বট্রাইটিস ব্লাইটঃ ছত্রাক দ্বারা এই রোগ হয়ে থাকে। এই রোগে পাতা ও ফুল আক্রান্ত হয়। প্রাথমিকভাবে পাতার এক পাশে ছোট বাদামী বা ধূসর দাগ দেখা দেয়। তবে আক্রমণ বেশি হলে অন্য পাশেও দাগ দেখা দেয়। পাঁপড়ির উপর ছোট থেকে বড় পানির মত ভিজা দাগ দেখা দেয় যা পরবর্তীতে ধূসর দাগে পরিণত হয়। ঠান্ডা ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এই রোগ বেশি হয়।

    ব্যবস্থাপনাঃ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ এই রোগকে অনেকটা নিয়ন্ত্রনে রাখে। ডাইথেন এম-৪৫ ১৫ দিন পর পর প্রতি লিটার পানিতে ১ থেকে ২ গ্রাম অথবা বেনডাজিম/মেটাজেব/মেনকোজেব প্রতি লিটার পানিতে ১ থেকে ২ গ্রাম হারে স্প্রে করে এই রোগ দমন করা যায়।

    ফিউজেরিয়াম রটঃ ছত্রাক দ্বারা এই রোগের সৃষ্টি হয়। এই রোগে গাছের বৃদ্ধি ধীর হয়ে কান্ড ও পাঁপড়ি বিকৃত আকার ধারণ করে এবং স্পাইক খুব কম বের হয়। কর্ম ও করমেল সংরক্ষনের পূর্বে অথবা সংরক্ষণের সময় পচে যায়।

    ব্যবস্থাপনাঃ এই রোগের আক্রমণ রোধ করা খুব কঠিন। তবে প্রতিরোধী ও সহনক্ষম জাত ব্যবহার করে এই রোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। সুস্থ কর্ম ব্যবহার, পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ এবং কর্ম ও কর্মেল শোধন করেও এই রোগ প্রতিহত করা যায়। এটি একটি বীজ ও মাটি বাহিত রোগ। যে সমসত্ম মাটিতে বায়ু চলাচল কম এবং মাটিতে পানি জমে থাকে সেখানে এই রোগ বেশি হয়। প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম ব্যাভিস্টিন/বেনডাজিম/কার্বেন্ডাজিম এবং ২ গ্রাম মেনকোজেব/মেটাজেব একত্রে মিশিয়ে কর্ম শোধন করে এবং একই ওষধ দিয়ে মাটি ভিজিয়ে এই রোগ প্রতিরোধ করা যায়।

    ভাইরাসঃ গ্লাডিওলাস অনেক কর্ম ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হলে গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়, পাতা, ফুল ও স্পাইক বিকৃত হয় এবং রঙিন ফুলের উপর লম্বা দাগ পড়ে।

    ব্যবস্থাপনাঃ একবার আক্রান্ত হলে কর্মসহ গাছ পুড়িয়ে ফেলতে হবে। কর্মেল-এ ভাইরাস প্রবেশ করার আগেই সংগ্রহ করা হলে রোগমুক্ত কর্মেল পাওয়া যেতে পারে। কিছু কিছু ভাইরাস পোকা দ্বারা ছড়ায় বলে প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি স্টার্টার/টাফগর/পারফেকথিয়ন কীটনাশক স্প্রে করে এ রোগকে দমন করা যায়।

    ফুল কাটাঃ কর্ম লাগানোর ৭৫ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে গাছে ফুল আসে। স্পাইক এর নিচের দিকে ১ থেকে ২ টি ফুলে  (ফ্লোরেট) রং দেখা দিলে স্পাইক (যে দন্ডটি ফুল ও পাতা ধরে রাখে) কাটতে হবে। স্পাইক কাটার পর গাছে ৪ থেকে ৫ টি পাতা এবং স্পাইকে ১ থেকে ২টি ফুটন্ত ফুল থাকতে হবে। ফুল কাটার সাথে সাথে সেগুলো ছায়ায় কিছু সময় রাখতে হবে।

    কর্ম তোলা ও সংরক্ষণ

    ক) কর্ম তোলাঃ ফুল কাটার ৬ থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যে কর্ম উঠাতে হবে। (গাছের পাতা যখন হলুদ ও বাদামী রং এর হয় )। ফুল কাটার ৯০ থেকে ১০৫ দিনের মধ্যে কর্ম উঠালে খুবই ভালো মানের কর্ম পাওয়া যায়, যা থেকে পরে ভাল ফুল পাওয়া যায়। তোলার সময় কর্ম এর গায়ে যেন কোন আঘাত না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

    খ) সংরক্ষণঃ কর্ম ও কর্মেলকে ব্যাভিষ্টিন ১% দ্রবনে ৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখতে হবে। তারপর আলো-বাতাসযুক্ত স্থানে ভালোভাবে শুকিয়ে নিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে। কর্মকে ২.৫ থেকে ৫ সে. তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে। দেশীয় পদ্ধতিতে কর্ম ও কর্মেল আলো-বাতাসযুক্ত স্থানে বাঁশের মাচা অথবা কাঠের ট্রেতে এক সত্মর করে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। বালতিতেও কর্ম সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন এক জাত অন্য জাতের সাথে মিশ্রিত না হয়। সংরক্ষণের সময় কর্মের উপরের খোসা ছাড়ানো উচিত নয়। অল্প পরিমাণ কর্মের ক্ষেত্রে রেফ্রিজারেটরের সাধারণ তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা যেতে পারে। কর্মেল সংখ্যায় বেশি এবং আকারে ছোট থাকে বলে ছিদ্রযুক্ত নাইলনের ব্যাগে ভরে বাঁশের আড়ার সাথে ঝুলিয়ে রেখেও সংরক্ষণ করা যায়। কর্ম ও কর্মেল সংরক্ষণ করার পরে সংরক্ষিত স্থান মাঝে মাঝে পরিদর্শন করে খেয়াল রাখতে হবে যেন পোকামাকড়ের আক্রমণ বা রোগাক্রান্ত না হয়।

    ফলনঃ একর প্রতি ১ লক্ষ ৩৫ হাজার কর্ম থেকে ১ লক্ষ ৫ হাজার থেকে এক লক্ষ ২০ হাজার পর্যন্ত স্টিক পাওয়া যায়। একর প্রতি ৪ হাজার কেজি কর্ম ও প্রায় ৫ হাজার কেজি কর্মেল পাওয়া যায়। প্রতিটি কর্মের ওজন প্রায় ৭০ থেকে ৮০ গ্রাম এবং প্রতিটি কর্মেলের ওজন প্রায় ২০ থেকে ৫০ গ্রাম। প্রতিটি কর্ম থেকে প্রায় ১০ থেকে ১৫টি কর্মেল প্রায় যায়।

    প্রক্রিয়াজাতকরণঃ কাটা ফুল বেশি দিন তাজা রাখতে দ্রবণে ৬০০ পিপিএম ৮-হাইড্রক্সি কুইনোলাইন সাইট্রেট এর সাথে ৪% চিনির দ্রবণ মিশিয়ে দিতে হবে। স্পাইককে পলিথিনে মুড়ে কার্টুনে রাখতে হবে। কার্টুনটি ৪ থেকে ১০ সে. তাপমাত্রায় তিন দিন পর্যন্ত রাখতে হবে।

    প্যাকিং: ৫ ফুট লম্বা, ২৪ ইঞ্চি চওড়া এবং ১২ ইঞ্চি উচ্চতা বিশিষ্ট ছিদ্র কাগজের বা যুক্ত কাঠের বাক্সে স্পাইক গুলি রাখতে হবে। বাক্সের চারিদিকে স্পাইক এবং বান্ডেলের ফাঁকে ফাঁকে শোষক তুলা রাখতে হবে।

    রজনীগন্ধা চাষ পদ্ধতি

  • Share The Gag
  • পরিচিতিঃ রজনীগন্ধার সুবাস সব মানুষের মনে প্রশান্তি আনে। বিশেষ করে রাতের বেলা এর আবেদনময়ী ঘ্রান সকলকে পাগল করে তোলে। এ ফুল সচরাচর সাদা হওয়ায় বাগানের শোভা বাড়ানো ছাড়াও বিভিন্ন উৎসব, অনুষ্ঠান ও গৃহ সজ্জায় ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। দিনদিন এই ফুলের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে আমাদের দেশে বানিজ্যিকভাবে এর যথেষ্ঠ চাষাবাদ হচ্ছে।

    জাতঃ ফুলের পাঁপড়ির সারি অনুযায়ী রজনীগন্ধা দুই বা তিন ভাগে বিভক্ত, যেমন-সিঙ্গেল, সেমি-ডবল ও ডবল। যে সব জাতের ফুলের পাঁপড়ি একটি সারিতে থাকে সে সব জাতগুলি সিঙ্গেল শ্রেনীভুক্ত, যে সব জাতের ফুলের পাঁপড়ি দুই বা তিন সারিতে থাকে সে জাতগুলিকে সেমি-ডবল এবং তিন-এর অধিক পাঁপড়ির সারি থাকলে সে জাতগুলিকে ডবল শ্রেনীর অমর্ত্মভুক্ত করা যায়।

    আবহাওয়াঃ উপযুক্ত বৃদ্ধির জন্য আর্দ্র আবহাওয়া এবং গড় তাপমাত্রা ২০থেকে ৩০সে. হওয়া দরকার। পর্যাপ্ত সূর্যোলোকসহ উপকূলীয় এলাকা ও বর্ষাকাল উৎপাদনের উপযুক্ত সময় । শীতকালে রজনীগন্ধা ফুলের উৎপাদন কমে যায়। তবে সেমি ডবল ও ডবল জাত শীতকালেও ফুল দিতে থাকে।

    জমি নির্বাচনঃ জৈব সার সমৃদ্ধ দো-আঁশ মাটি। উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি, পানি বের করে দেওয়ার সুব্যবস্থা যুক্ত মাটি। ছায়াহীন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল। পানি সেচ ব্যবস্থা আছে এমন এবং জমির pH মান ৬.৫ থেকে ৭.৫ আছে এমন জমি।

    কন্দ লাগানোর উপযুক্ত সময়ঃ


    • রবি মৌসুম: মধ্য আশ্বিন হতে কার্ত্তিকের শেষ (অক্টোবর হতে মধ্য নভেম্বর) পর্যন্ত।

    • খরিফ মৌসুম: ১লা চৈত্র থেকে বৈশাখের মাঝামাঝি (মধ্য মার্চ থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত)।


    কন্দের সংখ্যাঃ একর প্রতি ১২০০০ টি কন্দ লাগাতে হবে।

    ভাল জাতের বৈশিষ্ট্য


    • দেশীয় মাটি ও আবহাওয়ায় চাষ উপযোগী ;

    • রোগ বালাই প্রতিরোধক্ষম ;

    • সহজেই গাছ হেলে পড়ে না ;

    • প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে ;

    • উন্নত মানের কন্দ ;


    বংশ বিস্তারঃ সাধারণত: কন্দ দ্বারাই রজনীগন্ধার চাষ ও বংশ বিস্তার করা হয়। কন্দ থেকে উৎপন্ন গাছে মাতৃ গাছের সকল গুণাগুণ বজায় থাকে।

    রোপণ পদ্ধতিঃ জমি চাষ শেষ হলে ৫ ফুট প্রশসত্ম বেড তৈরি করতে হবে। বেড তৈরির ৭ থেকে ১০ দিন পর কন্দ রোপণ করা উচিত। ০.৬ থেকে ১.১৮ ইঞ্চি ব্যাসের কন্দ লাগাতে হবে। সারি থেকে সারির দূরত্ব ১২ ইঞ্চি এবং কন্দ হতে কন্দের দূরত্ব ৮ ইঞ্চি। কন্দকে ৬ ইঞ্চি গভীরে লাগাতে হবে। কন্দ রোপণের আগে কন্দের সুপ্তাবস্থা (যে সময়টুকুতে বীজ গজাবে না তাকেই সুপ্তাবস্থা বলে) কাটানোর জন্য কন্দ গুলোকে ৪ শতাংশ থায়ো ইউরিয়া জলীয় দ্রবনে প্রায় ৩০ মিনিট চুবিয়ে রাখতে হবে।

    জমি তৈরি ও সার প্রয়োগঃ প্রথম চাষের সঙ্গে প্রতি বিঘা জমিতে ৩ টন জৈবসার বা খামারের সার মিশাতে হবে এবং ৪-৫ বার গভীরভাবে চাষ দিয়ে অগাছামুক্ত করতে হবে ও জমির মাটি ঝুরঝুরে ও সমান করতে হবে। শেষ চাষের আগে প্রতি বিঘাতে ১৪:২৮:২৮ ইউরিয়া, টিএসপি,এমপি সার মূল সার হিসাবে জমিতে মিশতে হবে । এঁটেল মাটিতে ১০% সার কম দিলেও চলে। ২ মাস পর হতে প্রতি ২ মাস পর পর ৭ কেজি ইউরিয়া উপরি প্রয়োগ করতে হবে। জমি তৈরীর কাজ চারা লাগাবার অন্ততঃ ১৫ দিন আগে শেষ করতে হবে। টবে চাষের ক্ষেত্রে ২ ভাগ মাটি, ১ ভাগ পাতা পচা সার, ১ ভাগ পচা গোবর সার মিশিয়ে টব ভরে নিতে হবে। একটি টবে ২টি কন্দ লাগানো যায়।

    চাষের সময়ে পরিচর্যা

    (ক) সেচ ও পানি নিষ্কাশনঃ রজনীগন্ধার জমির মাটিতে সবসময় রস থাকা উচিত। গ্রীষ্মকালে ৭ দিন পরপর এবং শীতকালে ১০ দিন পরপর সেচ দেওয়া উচিত।

    (খ) আগাছা দমনঃ রজনীগন্ধার জমি সবসময় আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। আগাছা দমনের সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন কন্দের কোন ক্ষতি না হয়। আগাছা দমনে প্রয়োজনে অনুমোদিত আগাছানাশক ১.৮ কেজি/একর প্রতি স্প্রে করতে হবে।

    (গ) নিড়ানীঃ রজনীগন্ধার জমিতে নিড়ানী দিতে হবে। নিড়ানী দেওয়ার ফলে গাছ আলো, বাতাস ও পানি সহজেই পেতে পারে। নিড়ানীর ফলে জমির আর্দ্রতার ধারন ক্ষমতা বাড়ে এবং আগাছা মুক্ত রাখতে সাহায্য করে।

    পোকা-মাকড়, রোগবালাই এবং দমন পদ্ধতি

    রোগবালাই

    ধ্বসা রোগঃ এ রোগের ফলে গাছের শিঁকড়ে পচন ধরে। শেষে গাছের পাতা খসে যায় এবং ফুলের মঞ্জরীগুলো মাটিতে ঢলে পড়ে।

    ব্যবস্থাপনাঃ আক্রান্ত গাছগুলো তুলে ধ্বংস করতে হবে। গাছের গোড়ার মাটি প্রতি লিটার পানিতে ৪ গ্রাম কুপ্রাভিট/বেনডাজিম/ ব্যাভিস্টিন/ সেভিন মিশিয়ে সেই মিশ্রণ দিয়ে ভিজিয়ে দিতে হবে। রোগাক্রান্ত গাছে ১৫ দিন পরপর ২ থেকে ৩ বার প্রতি লিটার পানিতে ৪ গ্রাম হারে কুপ্রাভিট/বেনডাজিম/ব্যাভিস্টিন/সেভিন মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।

    শিকড়ে গিঁট রোগঃ কৃমি গাছের শিকড়ে গুটি তৈরি করে। এ রোগে আক্রান্ত গাছের শিকড়ের মাঝে মাঝে ফুলের গিঁটের মত হয়ে যায়। ফলে গাছের মাটি থেকে খাদ্য ও পানি নেয়া ব্যাহত হয়। গাছ সহজে বাড়ে না, ফুল আসেনা। দুর্বল হয়ে শেষে গাছ মরে যায়।

    ব্যবস্থাপনাঃ একই জমিতে পরপর দু’তিন বছর এক নাগাড়ে রজনীগন্ধা ও বেগুন জাতীয় ফসর চাষ না করা ভাল। দু’সারি রজনীগন্ধা গাছের মধ্যে এক সারি গাঁদা গাছ লাগিয়ে গাঁদা-রজনীগন্ধার মিশ্র চাষ করলে শিকড়ে গিঁট কৃমির উপদ্রব কম হয়। জমিতে নিম খৈল ছিটানো যেতে পারে। কন্দ রোপণের সময় সারির মাটিতে নিম খৈল ও নিউফরান ছিটিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। তারপর সেখানে কন্দ রোপণ করলে এ রোগের আক্রমণ অনেক কম হয়। প্রাথমিকভাবে অল্প গাছ আক্রান্ত হলে সেসব গাছ তুলে জমি থেকে দূরে ফেলতে হবে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। আক্রান্ত স্থানের মাটি কিছুটা গর্ত করে খড় জ্বালিয়ে মাটি পুড়াতে হবে।

    পাতার দাগ রোগঃ এ রোগের ফলে রজনীগন্ধার গাছের পাতার অগ্রভাগ থেকে প্রথমে দাগ পড়ে। পরে তা শুকিয়ে বাদামী হয়ে যায় ও ধীরে ধীরে নীচের দিকে পাতার কিনারা বরাবর ঢেউ খেলানো দাগের মত নামতে থাকে। গাছ দুর্বল হয়ে শেষে মরে যায়।

    ব্যবস্থাপনাঃ একই জমিতে পরপর এক নাগাড়ে রজনীগন্ধা চাষ না করা ভাল। প্রাথমিকভাবে অল্প গাছ আক্রান্ত হলে সেসব গাছের আক্রান্ত অংশ কেটে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। জমি তৈরির সময় একর প্রতি ৬ থেকে ৯ কেজি হারে রুটোন/এগ্রো-গ্রো (দানাদার) প্রয়োগ করলে শিকড়ের রোগ বালাই কম হয়।

    ফুল কাটাঃ কন্দ লাগানোর ৭০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে গাছে স্টিক আসতে শুরু করে। স্টিক কাটার সময় ধারালো ছুরি ব্যবহার করতে হবে। রজনীগন্ধার স্টিকের প্রথম ফুল ফুটলেই ডাঁটিসহ ফুল কাটতে হবে। ভোরের ঠান্ডা আবহাওয়ায় অথবা পড়ন্ত বিকেলে ফুল কাটতে হবে। স্টিক কাটার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন এটি মাটি থেকে ১.৫ থেকে ২.৫ ইঞ্চি উপরে থাকে। কাটার সাথে সাথে স্টিক গুলির নীচের কাটা অংশ পানিতে চুবিয়ে ছায়ায় রাখতে হবে , যেন ফুল ও স্টিকের সতেজভাব বজায় থাকে।

    ফুল উৎপাদনঃ একর প্রতি রজনীগন্ধার স্টিক উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ১৫০০০০ থেকে ২০০০০০টি।

    কন্দ উত্তোলন ও সংরক্ষণঃ রজনীগন্ধার কন্দ সহজেই উত্তোলন  ও সংরক্ষণ করা যায়। ডিসেম্বর-জানুয়ারী মাসে গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে গেলে কন্দ গুলি মাটি থেকে তুলে এনে পরিস্কার করে ছায়াযুক্ত শুকনো মেঝেতে ছড়িয়ে রাখতে হয়। পরিপক্ক কন্দগুলি পরবর্তীতে বীজ হিসাবে ব্যবহার করা হয়।

    প্রক্রিয়াজাতকরণঃ রজনীগন্ধা ফুল ও পাতা থেকে পানি বের হয়ে গিয়ে ফুল ও পাতা শুকিয়ে যেতে পারে। এজন্য অতিদ্রুত অপ্রয়োজনীয় পাতা কেটে ফেলতে হবে। এর পর বান্ডিল তৈরি  করে প্রথমে ভেজা নিউজপ্রিন্ট কাগজে স্টিক গুলো মুড়ে ও পরে কালো পলিথিনে জড়িয়ে ঠান্ডা পরিবেশে প্রায় ৪ ঘন্টা গোড়ার কাটা অংশ পানিতে চুবিয়ে রাখতে হবে। এ প্রক্রিয়ায়  ফুলের  সতেজতা র্দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকে।

    গোলাপ চাষ পদ্ধতি

  • Share The Gag
  • পরিচিতিঃ গোলাপ একটি শীতকালীন মৌসুমী ফুল। তবে বর্তমানে গোলাপ সারা বছর ধরেই চাষ করা হচ্ছে। বর্ণ, গন্ধ, কমনিয়তা ও সৌন্দর্যের বিচারে গোলাপকে ফুলের রানী বলা হয়। পুষ্প প্রেমীদের সবচেয়ে প্রিয় ফুল গোলাপ। এটি বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জলবায়ুতে খুব সহজেই মানিয়ে নিতে পারে বলে পৃথিবীর সব দেশেই সারাবছর কমবেশি গোলাপের চাষ হয়। গোলাপ সাধারণত কাট ফ্লাওয়ার হিসেবে বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে, বাগান, লন, কেয়ারী, বারান্দা সাজাতে গোলাপের জুড়ি নাই। আতর ও সুগন্ধি শিল্পেও গোলাপের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।

    গোলাপের জাতঃ গোলাপের জাত প্রধানত ৭টি। যথা-হাইব্রিড টি, হাইব্রিড পার্পেচুয়েল, পলিয়েন্থা, ফ্লোরিবান্ডা, মিনিয়েচার এবং প্লেমবার।

    জমি নিবার্চনঃ পানি জমেনা এমন ধরনের মাটিতে এই ফুল ভাল হয়; তবে জৈব সার মিশ্রি্ত দো-আঁশ মাটি খুবই উপযোগী। উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি, ছায়াহীন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল, পানি সেচ সুবিধা আছে এমন এবং জমির পিএইচ মান  ৬.০ থেকে ৭.৫ এর মধ্যে আছে এমন জমি।

    আবহাওয়াঃ ফুলের ভাল বৃদ্ধির জন্য ৬ ঘন্টা সূর্যের আলো দরকার। তাপমাএা  ১৫থেকে ২৫ সেলসিয়াস থাকা ভাল।

    গোলাপের চারা লাগানোর সময়ঃ গোলাপ গাছের চারা লাগানোর সময় নির্ভর করে সেই অঞ্চলের জলবায়ুর উপর । তবে আমাদের দেশে সারা বছরই লাগানো হয়। সাধারণতঃ দুই মৌসুমে এই ফুলের চাষ করা হয়ে থাকে। একর প্রতি ১২ হাজার টি চারা লাগাতে হবে।

    রবি মৌসুমঃ সেপ্টেম্বরের শুরু হতে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত (ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি হতে আশ্বিন মাসের শেষ পর্যন্ত)।

    খরিপ মৌসুমঃ মার্চের মাঝামাঝি হতে মধ্য এপ্রিলের মাঝ পর্যন্ত ।

    লক্ষণীয়ঃ অতিরিক্ত গরম ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ঊভয়ই গোলাপ ফুল চাষে বাধার সৃষ্টি করে।

    বংশবৃদ্ধিঃ কয়েক প্রকার বীজ থেকে গোলাপের চারা তৈরি করা গেলেও চাষের জন্য প্রধানত কলমের চারাই ব্যবহার করা হয়। সাধারণত গুটি কলম, শাখা কলম (কাটিং), চোখ কলম (বাডিং) ইত্যাদি উপায়ে গোলাপের চারা প্রস্ত্তত করা যায়।

    ক. গুটিকলমঃ যে গাছের চারা তৈরি করা হবে সে গাছের একটি সুস্থ্য সবল ডালের ৩-৫ সেঃমিঃ পরিমাণ ছাল গোল করে একটি ধারালো ছুরি দিয়ে তুলে দিতে হয়। এরপর দো-আঁশ মাটি ও পচা গোবর সার সমান অংশে মিশিয়ে সেই ছালতোলা জায়গায় মুঠো করে লাগিয়ে দিতে হয়। মাটিটি পরে পরিথিন দিয়ে বেঁধে দিতে হয়। এতে মাটির জল শুকাতে পারে না, তাছাড়া শিকড় বের হলে বাইরে থেকে দেখতে সুবিধা হয়। যদি জল শুকিয়ে যায় তা হলে ইনজেকশানের সিরিঞ্জ দিয়ে জল ঢুকিয়ে দিতে হয়। ৫-৬ সপ্তাহের মধ্যেই শিকড় বের হয়। তখন পলিথিনের বাঁধনের ঠিক নিচে প্রথম দফায় অর্ধেক এবং ২/৩ দিন পর বাকি অর্ধেক আলগা করে কলমটি ২/৩ দিন ছায়ায় রেখে পরে পলিথিনের বাঁধন খুলে মাটিতে লাগাতে হয়।

    খ. শাখা কলমঃ শাখা কলম তৈরির জন্য শক্ত ও নিখুঁত শাখা নির্বাচন করতে হয়। প্রায় ২০-২২ সেঃমিঃ লম্বা করে কলমের ডাল এমনভাবে কাটতে হয় যেন উপরের মাথা সমান ও নীচের মাথা অর্থাৎ সে মাথা মাটিতে পোঁতা হবে তা তেছরা থাকে। ডালের নীচের কয়েকটি পাতা ও কাঁটা ভেঙ্গে ফেলে জৈব সার মেশানো ঝুরঝুরে মাটিতে পুঁতে দিয়ে নিয়মিত জলদিতে হয়। ৬/৭ সপ্তাহ সময়ের মধ্যে কলম তৈরি হয়। সেব বিদেশী গোলাপের কাষ্ঠল অংশ কম সেগুলোতে প্রায়ই কলম হতে চায় না।

    গ. চোখ কলমঃ চোখ কলম দ্বারা অতি অল্প সময়ের মধ্যেই বহু সংখ্যক চারা উৎপন্ন করা যায়। এ পদ্ধতিতে জংলী গোলাপ গাছের শাখা বা কান্ডের সাথে ভাল জাতের গোলাপের কুঁড়ি বা চোক লাগিয়ে তৈরি করতে হয়। এ পদ্ধতিতে দেশী জংলী গোলাপ গাছকে শিকড় গাছ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কেননা এদের ফুল ভাল মানের না হলেও দেশীয় আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে বেঁচে থাকতে পারে। আষাঢ়-শ্রাবন মাসে জংলী গোলাপের ডাল কেটে কাটিং লাগাতে হয়। আমাদের দেশে কুঁড়ি সংযোজন করার উপযুক্ত সময় হচ্ছে অগ্রহায়ণের প্রথম থেকে মাঘের মাঝামাঝি পর্যন্ত।

    এ পদ্ধতিতে শিকড়-গাছের বর্ধনশীল কান্ডে বা গোড়ার দিকে খুব ছোট ধারালো ছুরি দিয়ে ইংরেজী T অক্ষরের মত করে শিকড় গাছের কাটা স্থানে এমন করে বসাতে হয় যাতে কুঁড়িটি বাইরে থাকে।এভাবে কুঁড়িটি স্থাপন করে পলিথিনের চিকন ফিতা দিয়ে বেঁধে দিতে হয় এবং শিকড় গাছের অংশ কেটে ফেলতে হয়। এভাবে ৩/৪ দিন ছায়ায় রেখে পরে রোদে দিতে হবে। প্রথম কয়েক দিন এমন ভাবে জল দিতে হবে যাতে কুঁড়ির সংযোগ স্থল না ভিজে। শিকড় গাছের কোন মুকুলযাতে গজাতে বা বাড়তে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যদি গজায় তাহলে সেগুলোকে ভেঙ্গে দিতে হয। ২-৩ সপ্তাহের মধ্যেই আসল কুঁড়ি থেকে চারা বেরিয়ে আসবে। এটি বেশ কিছু বড় হলে পলিথিনের বাঁধন সাবধানে খুলে দিতে হয় যাতে গোড়ার অংশ ঠিকমত বা

    জমি তৈরীঃ জমি বেশি শুকনো থাকলে হালকা সেচ দিয়ে জো আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। জৈব সার মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। জমির  pH  ঠিক রাখার জন্য চুন অথবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সার দিতে হবে। জমিতে গভীর চাষ অর্থাৎ ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি গভীরতায় জমি চাষ দিতে হবে। পোকা মাকড় মুক্ত রাখতে জমি চাষের সময় ক্লোরডেন এবং মাটি বাহিত রোগ থেকে মুক্ত রাখার জন্য ব্রোমাইড ক্লোরোপিকরিন (১৬২ কেজি /একর) প্রয়োগ করতে হবে। শেষ চাষের সময় পরিমাণমত টিএসপি ও এমওপি সার জমিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে ।

    রোপণ পদ্ধতিঃ দেশীয় গোলাপ ফুল কাটিং পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করে বেড সিস্টেমে লাগিয়ে নির্বাচিত জাতের সায়ন (যে ডাল দিয়ে কলম করা হয়) সংগ্রহ করে বিভিন্ন কলম (জোড় কলম, চোখ কলম ইত্যাদি) পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করা হয়। যে চারাটি উৎপন্ন হলো, তার গোড়ায় মাটির বল তৈরী করে নির্দিষ্ট জমিতে  লাগানো হয়। চারাটি লাগাতে সাধারণত: ২০ থেকে ৩০ সেমি (৮ থেকে ১২ ইঞ্চি) আয়তনের এবং ২৫ থেকে ৩০ সেমি (১০ থেকে ১২ ইঞ্চি) গর্ত তৈরী করে , তার ভিতর ভালোভাবে বসাতে হয় এবং গর্তটি মাটি দিয়ে ভালোভাবে আটকাতে হবে। যে গাছ দ্রুত বাড়ে তার জন্য ২ ফুট (গাছ থেকে গাছ) এবং ৩ ফুট (সারি থেকে সারির) দূরত্ব বজায় রাখতে হয়। কলমের নীচের অংশ হতে কোন ডালপালা হতে দেওয়া যাবেনা।

    সার প্রয়োগ


















































    সারের নাম

    পরিমাণ/একর প্রতি

    প্রয়োগ সময়

    কাঁচা গোবর

    ২০০০ কেজি

    জমি তৈরির সময়

    জৈব সার

    ৬০০ কেজি

    জমি তৈরির সময়

    টিএসপি

    ৫০ কেজি

    জমি তৈরির সময়

    এমওপি

    ২০ কেজি

    জমি তৈরির সময়

    ইউরিয়া

    ১০০ কেজি (প্রথম বছর)

    চারা লাগানোর ২০ থেকে ২৫ দিন পর

    ইউরিয়া

    ১৫ কেজি

    কুঁড়ি বের হওয়ার পূর্বে

    দসত্মা

    ১২ কেজি

    জমি তৈরির সময়

    খৈল

    ১৫০ কেজি

    জমি তৈরির সময়

    চাষের সময়ে পরিচর্যা

    (ক) সেচ ও পানি নিষ্কাশনঃ গোলাপের চারা লাগানোর ২ থেকে ৩ দিন পরে জমিতে হালকা সেচ দিতে হবে। পরবর্তীতে ১৫ থেকে ২০ দিন পর পর সেচ দিতে হবে। জমিতে বৃষ্টির অথবা সেচের কারণে অতিরিক্ত পানি জমা থাকলে তা বের করে দিতে হবে।

    (খ) আগাছা দমনঃ আগাছা ফুল গাছের কোন ক্ষতি করার আগেই তা দমন করা উচিত। আগাছা দমনে আগাছা নাশক ট্রাইফ্লুরালিন ১.৮ কেজি /একর স্প্রে করতে হবে।

    (গ) ডালপালা ছাঁটাইকরণঃ গোলাপ গাছের ডালপালা ছাঁটাই করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ডালপালা ছাঁটাই-এর মাধ্যমে গাছের মৃত, দুর্বল, রোগাক্রান্ত, ও নষ্ট অংশ দূর করা হয়। যার ফলে নতুন ডালপালা জন্মে ও নতুনভাবে ভাল ফুল উৎপন্ন সম্ভব হয়।

    (ঘ) মালচিং: (সাধারণত: কম্পোষ্ট, গোবর সার, খড়, কাঠের গুড়া, চালের কুঁড়া, কচুরিপানা প্রভৃতি দিয়ে ঢেকে দেওয়াকে মালচিং বলে)। গোলাপ গাছে মালচিং করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ-মালচিং মাটিকে ভেজাভেজা (আর্দ্র) রাখতে সাহায্য করে, জৈব সার তৈরিতে সাহায্য করে, আগাছা কমতে সাহায্য করে।

    (ঙ) নিড়ানীঃ গোলাপ চাষের জমিতে হালকা নিড়ানী দিতে হবে । নিড়ানী দিলে গাছের মূল সহজেই আলো বাতাস,পানি পায় যার ফলে মাটির আর্দ্রতার ধারন ক্ষমতা বাড়ে এবং আগাছা মুক্ত রাখতে সাহায্য করে।

    রোগবালাই ব্যবস্থাপনা

    জাবপোকাঃ পাতা, ডগা, ডাল, কুড়িঁ, ফুল ইত্যাদির উপর দলবেধে বসে থাকে এবং রস চুষে খায়। ফলে আক্রান্ত স্থান দুর্বল হয়ে শুকিয়ে যায়। কান্ড সরু হয়ে শাখা-প্রশাখা কমে যায় এবং গাছ নিসেত্মজ হয়ে পরে, আক্রান্ত কুঁড়ি ফোটে না ও ফুল উৎপাদন কমে যায়।

    ব্যবস্থাপনাঃ প্রাথমিকভাবে গাছে দু’একটি পাতায় আক্রমন দেখা দিলে সেসব পাতা তুলে পাতার পোকা পিষে মেরে ফেলতে হবে। আধা লিটার পানিতে ১ থেকে ২টি তামাক পাতা ৩ থেকে ৪ দিন ভিজিয়ে রেখে ছেকে সেই মিশ্রণ স্পঞ্জে নিয়ে জাব পোকা আক্রান্ত স্থানে আসেত্ম আসেত্ম মুছে দিলে জাব পোকা চলে যায়। এভাবে প্রতি ১০ দিন পর ৩ বার মুছে দিলে জাব পোকা থাকে না। টবে বা বাগানে লাগানো স্বল্প কয়েকটি গাছে অল্প আক্রমণ দেখা দিলে এ পদ্ধতিতে ভাল ফল পাওয়া যায়। আক্রান্ত গাছে ১ লিটার পানিতে ৩ থেকে ৪ গ্রাম গুড়া সাবান/ডিটারজেন্ট গুলে স্প্রে করা যেতে পারে। আক্রমণ বেশি হলে ম্যালাটাফ ৫৭ ইসি বা ফাইফানন ৫৭ ইসি বা ম্যালাডান ৫৭ ইসি/পারফেকথিয়ন/স্টার্টার/টাফগর ৪০ ইসি ২ মিলি/লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

    থ্রিপসঃ প্রথম আক্রমণ দেখা যায় ডগার নরম অংশে। পাতা বের হওয়ার আগে পাতা কুঁকড়ে যায়। কচি পাতা ও ফুলে আক্রমণ বেশি হয়। পাতার রং ফ্যাকাশে হয়ে যায়, কুঁচকে যায়, বাদামী ও কালো তিল তিল দাগ পড়ে, কুঁড়ি ভালভাবে ফোটে না। পাতা ও গাছের বৃদ্ধি কমে যায়।

    ব্যবস্থাপনাঃ সব রকমের আবর্জনা ও গোবর সার বাগান থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। সাবান পানি এমনকি শুধু পানি নিয়মিতভাবে বৃষ্টির মত স্প্রে করেও থ্রিপস কমানো যায়।  গোলাপ বাগানে আঠাযুক্ত সাদা ফাঁদ পেতেও থ্রিপস কমানো যায়। মেটাসিস্টক্স আর ২৫ ইসি বা মিপসিন ৭৫ ডবিস্নউপি বা সুমিথিয়ন ৫০ ইসি ১ মিলি/লিটার অথবা পারফেকথিয়ন/স্টার্টার ২ মিলি/লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

    জ্যাসিডঃ কীড়া অবস্থা থেকেই এরা পাতার রস চুষে খেতে শুরু করে। ফলে আক্রান্ত পাতা ফ্যাকাশে ও বিবর্ণ হয়ে যায়, শেষে শুকিয়ে ঝড়ে পড়ে।

    ব্যবস্থাপনাঃ স্টার্টার/পারফেকথিয়ন ২ মিলি/লিটার অথবা মর্টার ৪৮ ইসি ১ মিলি/লিটার বা পাইরিফস ২০ ইসি ২ মিলি/লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

    কুঁড়ি ছিদ্রকারী পোকাঃ এ পোকা কুঁড়ি খেয়ে নষ্ট করে। পোকার বাচ্চা বা কীড়া কুঁড়ির ভেতরের অংশ খাওয়ার পর বাইরে বেরিয়ে আসে। যে কুঁড়িতে আক্রমণ করে তার বাজার মূল্য কমে যায়।

    ব্যবস্থাপনাঃ প্রথম দিকে নিমজাত নির্যাস ব্যবহার করতে হবে। জমির চারপাশে পাখি বসার ব্যবস্থা করতে হবে। নিমতেল ১ মিলিলিটার/লিটার পানি মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে প্রতিলিটার পানিতে ২ গ্রাম ফিলটাপ/কাপ/কারটাপ অথবা ১ মিলি মর্টার/ ২মিলি পাইরিফস ও ১ মিলি বুস্টার/রেলোথ্রিন/রিপকর্ড একত্রে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

    মাকড়ঃ পাতা থেকে রস চুষে খেতে থাকে ফলে পাতার উপরে পিঠে পিন ফুটানো দাগের মত দাগ দেখা যায়। পাতর রং হলদে বা বাদামী রঙের ফ্যাকাশে হয়ে যায় এবং শেষে ঝরে পড়ে।

    ব্যবস্থাপনাঃ প্রাথমিক অবস্থায় আক্রান্ত পাতার কান্ড ছিড়ে ধবংস করতে হবে। টবে বা বাগানে নিম খৈল প্রয়োগ করতে হবে। শুধু পরিষ্কার পানি স্প্রে করে মাকড় দমন করা যায়। নিম্বিসিডিন বা নিমতেল ১ মিলি/লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। ৮০% সালফার বা থিওভিট/এগ্রিসাল/কুমুলাস ২ থেকে ৩ গ্রাম/লিটার হারে পানিতে মিশিযে স্প্রে করতে হবে। তবে এবাটিন ১.৮ ইসি ১ মিলি/লিটার হারে পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করলে বেশি সুফল পাওয়া যায়।

    গোলাপের ডগা শুকানো রোগঃ ছত্রাকের কারণে রোগ হয়। কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রোগের লক্ষণ প্রধানত: কোন ছাঁটাই করা ডালের কাটা অংশের আগায় দেখা যায়।  কাটা প্রান্ত থেকে নীচে সামান্য কিছুটা অংশ শুকিয়ে কাল কাল হয়ে যায়। শুকানোর দাগ ডালটির একপাশে অথবা ডালটির চারপাশে ঘিরে বৃত্তাকারে দেখা যেতে পারে। অনুকুল পরিবেশে আক্রান্ত ডালটি পুরোপুরি শুকিয়ে কাল হয়ে যায় এবং পাতা ঝরে যায়।  ডালের আগা থেকে শুকাতে শুকাতে নীচের দিকে নামতে থাকে। শেষে রোগের আক্রমণে শিকড়গুলোও শুকিয়ে যায় এবং গাছটি মারা যায়।

    ব্যবস্থাপনাঃ আক্রান্ত ডাল অন্তত: পক্ষে আক্রান্ত অংশ থেকে প্রায় তিন ইঞ্চি নীচে ধারালো ছুরি বা ছুরিজাতীয় জিনিস দিয়ে কেটে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। ডাল কাটা যন্ত্রটি স্পিরিটে ডুবিয়ে শোধন করে নিতে হবে। গোলাপ ডাল ছাঁটাইয়ের পর কপার অক্সিক্লোরাইড পেস্ট আকারে মাথায় লাগাতে হবে। ছত্রাকনাশকের পেস্ট বিশেষ করে কপার অক্সিক্লোরাইড পেস্ট আকারে লাগিয়ে দিতে হবে। গোলাপ গাছে নিয়মিতভাবে সুষমমাত্রায় সার এবং সেচ প্রয়োগ করতে হবে। কপার অক্সিক্লোরাইড ৪ গ্রাম/লিটার হারে পানিতে মিশিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করতে হবে। গাছে ফুল থাকলে কুপ্রাভিট/কপার অক্সিক্লোরাইড স্প্রে করা যাবে না। এক্ষেত্রে ম্যানকোজেব/এন্টিব্লাইট ২.৫ গ্রাম/লিটার হারে পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

    গোলাপের পাতার কাল দাগ রোগঃ এটি একটি ছত্রাকজনিত রোগ এবং রোগ সংক্রমণকারী ছত্রাক ইথিলিন গ্যাস ত্যাগ করে এবং ঐ গ্যাসের প্রভাবে গাছের পাতা মরে যায় । গোলাপ গাছে এই রোগের আক্রমণ ব্যাপকভাবে দেখা দেয়। রোগের ফলে পাতার দু’পিঠে গাঢ় কাল রঙের দাড় পড়ে। কাপড়ের পাড় কোঁচকালে যেমন দেখায়, দাগের কিনারা দেখতে ঠিক সেই রকম। কোন কোন জাতের গোলাপ গাছে, রোগ সংক্রমণ শুরু হওয়ার ঠিক পর থেকে ব্যাপকভাবে পাতা ঝরতে দেখা যায়। আবার কোন কোন জাতের গোলাপ গাছ তীব্রভাবে রোগাক্রান্ত হলেও পাতা ঝরে যায় না। তীব্রভাবে আক্রান্ত পাতাগুলো (অসংখ্য দাগযুক্ত) গাছে লেগে থাকে।

    ব্যবস্থাপনাঃ কাটিং ও চারা শোধন করে টবে বা বাগানে রোপণ করতে হবে। সুস্থ সবল গাছ থেকে কাটিং সংগ্রহ করতে হবে।  রোগাক্রান্ত ঝরা পাতা কুড়িয়ে নিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। নিয়মিত যত্ন এবং প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম লিবরেল দসত্মা ও ২ গ্রাম লিবরেল বোরন একত্রে স্প্রে করলে সুফল পাওয়া যায়। এ রোগে জৈব সার প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আক্রান্ত কান্ড, ডগা ছেঁটে ফেলা এবং ছাঁটাই অংশে কপার অক্সিক্লোরাইডের পেস্ট লাগাতে হবে। কপার অক্সিক্লোরাইড ৪ গ্রাম/লিটার হারে পানিতে মিশিয়ে ৭ থেকে ১৪ দিন পর ৩ থেকে ৪ বার ভালোভাবে স্প্রে করে সম্পূর্ণ গাছ ভিজিয়ে দিতে হবে। অথবা ম্যানকোজেব/এন্টিবস্নাইট ২.৫ গ্রাম/লিটার পানিতে গুলে স্প্রে করতে হবে। স্প্রে করার সময় ঔষধ মিশ্রিত পানিতে ডিটারজেন্ট মিশিয়ে নিয়ে স্প্রে করতে হবে।

    গোলাপের পাউডারী মিলডিউ রোগঃ ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয়। মাটির উপরিভাগে অবস্থিত গাছের প্রত্যেক অংশে এই ছত্রাকের ব্যাপক সংক্রমণ ঘটে। গাছের নরম পাতাগুলো মুচড়ে যায়।  আক্রান্ত পাতার কিছু অংশ উপরের দিকে উঠে যায়। আক্রান্ত অংশে পাউডারের মত গুঁড়ি গুঁড়ি বস্ত্ত দেখা যায়। আক্রমণ তীব্র হলে আক্রান্ত অংশ শুকিয়ে যায় এবং এসব স্থানে কাল দাগ পড়ে। গাছের কচি ডালের ডগাতেও গুঁড়ি গুঁড়ি বস্ত্ত দেখা যায়। আক্রান্ত ফুলের কুঁড়িগুলি ভালোভাবে ফোটে না।

    ব্যবস্থাপনাঃ গাছের রোগাক্রান্ত অংশগুলি কেটে সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। প্রতি লিটার পানিতে দুই গ্রাম থিওভিট/এগ্রিসাল বা ৮০% সালফার মিশিয়ে ১০ থেকে ১২ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার প্রয়োগ করতে হবে।

    ফুল কাটাঃ চারা লাগানোর ৮০ থেকে ১১০ দিনের মধ্যে গাছে কুঁড়ি আসা শুরু হয়। কুঁড়ি অবস্থায় অর্থাৎ কুঁড়িটিতে রং দেখা যাবে  কিন্তু পাঁপড়ি গুলো মেলবে না সেই অবস্থায় কাটতে হবে। ফুল কাটতে ধারালো ছুরি বা ছুরিজাতীয় জিনিস ব্যবহার করতে হবে। খুব ভোরে এবং সূর্যাসেত্মর পূর্বে ফুল কাটার জন্য উপযুক্ত সময়। ফুলের সাথে লম্বা স্টিক রাখতে পারলে বাজার দর ভাল পাওয়া যায়।

    ফুল উৎপাদনঃ প্রতি বৎসরে একর প্রতি ফুল উৎপাদন হয় প্রায় ৩৭০৫০০ থেকে ৪৯৪০০০ টি।

    প্রক্রিয়াজাতকরণঃ ৪০০ পিপিএম হাইড্রক্সি কুইনোলিন সাইট্রেট এর সাথে ৪% চিনির দ্রবণ মিশিয়ে তা কুঁড়ির উপর স্প্রে করতে হবে। কুঁড়িকে পলিথিন মোড়কে মুড়ে কার্টুনে রাখতে হবে। এভাবে কার্টুনটি ৪ থেকে ১০ সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় তিন দিন সংরক্ষণ বা পরিবহন করা যাবে।

    প্যাকিং বা মোড়কীকরণঃ গোলাপ ফুল সংরক্ষণ করতে ৩.২৮ ফুট লম্বা ১৩ ইঞ্চি প্রশসত্ম ২.৫ ইঞ্চি উঁচু বক্স তৈরী করতে হবে। এই বক্সে ২৬ থেকে ২৮ ইঞ্চি লম্বা কান্ড বিশিষ্ট ৮০ টি গোলাপ রাখা সম্ভব। বক্সের ফাঁকে ফাঁকে পলিথিন ও পানি শোষক কাগজ রাখতে হবে। ২০টা কুঁড়ি নিয়ে একটা আঁটি রাবার ব্যান্ড দিয়ে এমনভাবে বাধঁতে হবে যেন কুড়ির কোন ক্ষতি না হয়। প্রতিটি বান্ডেলের উপরি ভাগ মোড়ক কাগজ দিয়ে বেঁধে সংযুক্ত ফিতা দিয়ে আটকাতে হবে।

    বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুল উৎপাদন

  • Share The Gag
  • ফুল পবিত্র। ফুল শুভ্রতা, সৌন্দর্য  ও শান্তির  প্রতীক। চিরকাল ধরেই ফুলের প্রতি মানুষের আকর্ষণ রয়েছে। পৃথিবীর বহুদেশে আজ অর্থকরী ফসল হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ হচ্ছে যা কিনা ফুলকে শিল্পে পরিণত করেছে। আমাদের দেশের মাটি ও আবহাওয়া ফুল চাষের খুবই উপযোগী। বাংলাদেশে দিন দিন ফুলের প্রতি ভালোবাসা বাড়ছে। জন্মদিন, বিয়ে, নানান ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন জাতীয় দিবসে ফুলের মালা, ফুলের তোড়া ব্যবহার হচেছ। বর্তমান বিশ্ব বাজারে বৎসরে ২০ বিলিয়ন ডলারের ফুলের ব্যবসায় ভারত, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, সিংগাপুর, ভিয়েতনাম, জাপান ইত্যাদি দেশগুলো উল্লেখযোগ্য হারে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। বাংলাদেশকেও বিশ্ব বাজারের ফুল চাষে অমত্মর্ভূক্ত করতে হলে বাণিজ্যিকভাবে ফুল উৎপাদনের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশের বিশাল গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ফুল চাষের ক্ষেত্রে এগিয়ে আসলে এবং বাণিজ্যিকভাবে চাষের পরিমাণ আরো বাড়াতে পারলে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব।


    যে সব জায়গায় বেশি পরিমাণে চাষ হয়ঃ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে যশোর (ঝিকরগাছা, শার্শা), ঢাকা (সাভার), গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, সাতক্ষীরা, কুমিল্লা প্রভৃতি অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ করা হচ্ছে।

    Friday, February 12, 2016

    ভালোবাসা দিবস ও মাতৃভাষা দিবসে ৮ কোটি টাকার ফুল বিক্রির টার্গেট

  • Share The Gag
  • টানা হরতাল, ধর্মঘট আর অবরোধের কারণে যশোরের হতাশাগ্রস্ত ফুল চাষীরা তাদের লোকশান পোষাতে ‘ভালবাসা দিবস’ ও ২১ শে ফেব্র“য়ারির আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সামনে রেখে ফুলের বাজার ধরতে ব্যস্ত সময় পার করছে তারা। রাজনৈতিক অস্থিরতায় জন্ম নেওয়া সব ক্ষত মুছে ফেলে দিবস দুটোকে সামনে রেখে নতুন করে মাঠে নেমেছেন ফুলের রাজধানী যশোরের গদখালির ফুল চাষীরা। তারা আশা করছেন, আর যদি হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি না দেয়া হয় তাহলে তারা অন্তত ভালবাসা দিবসের বাজারটি ধরতে পারবেন। এর পরপরই ২১শে ফেব্র“য়ারি আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস রয়েছে ফুলের বাজারের আর একটি বড় দিন। সব ঠিক থাকলে প্রায় ৮ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হবে বলে আশা করছেন গদখালী ফুলচাষী ও ফুল ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম।

    প্রতি বছর ১৪ই ফেব্র“য়ারি আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডাসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে পালিত হয়ে আসছে ভ্যালেন্টাইন ডে বা ভালবাসার দিন। এ ধারা থেকে পিছিয়ে নেই আমাদের বাংলাদেশের মানুষও। সারা পৃথিবীর সাথে তাল মিলিয়ে ভালবাসা দিবসকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত বাঙালিরাও। এ দিনে প্রিয়জনকে ফুল, মিষ্টি, চকলেট, কার্ড এবং অনান্য উপহার দিয়ে থাকেন সবাই। তবে ফুলের উপহারটাই বেশি, আর তার জন্য যশোরের গদখালির ফুল চাষিরা ফুল কেটে চালান শুরু করার সকল প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছে। এরপর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে দেশব্যাপী ফুলের চাহিদা তো রয়েছে।

    এমনই মনোরম ছবির অনবদ্য যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী এলাকা। বর্তমানে ওই এলাকার ২০টি গ্রামে দেড় হাজার হেক্টর জমিতে ফুলের চাষ হচ্ছে। বছরে প্রায় ৩শ কোটি টাকার ফুল বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। ৫ হাজার কৃষক রঙ-বেরঙের ফুল উৎপাদন করে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে রাখছেন। যশোরের এ ফুলকে কেন্দ্র করে সারা দেশের ১০ লাখ লোক ফুল বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। যশোরের উৎপাদিত ফুল বিক্রি হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, রাজশাহীসহ দেশের ৫৫টি জেলায়। সামান্য কিছু ফুল বিদেশেও রফতানি হচ্ছে।

    গদখালী এলাকার কৃষক শের আলী ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে রজনীগন্ধা ফুলের চাষ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং বেশকিছু বীজ নিয়ে আসেন। সেটা ১৯৮৩ সাল। পানিসরা গ্রামের শের আলী সর্বপ্রথম ৩০ শতক জমিতে রজনীগন্ধা ফুল উৎপাদনের মাধ্যমে এদেশে বাণিজ্যিকভাবে ফুলচাষ শুরু করেন। তার দেখাদেখি অন্য ভাইয়েরা ও গ্রামবাসী ফুলচাষে এগিয়ে আসেন। দীর্ঘদিন এলাকার কৃষকরা শুধু রজনীগন্ধারই চাষ করেছেন। এরপর শুরু হয় গোলাপ ও গ¬াডিউলাস ফুলের চাষ। গত ৩ বছর ধরে জারবেরা ও অল্পস্বল্প লিলিয়াম ফুলের চাষ হচ্ছে। বর্তমানে রজনীগন্ধা, গোলাপ, জারবেরা, গাঁদা, গ্লাডিউলাস, জিপসি, রডস্টিক ফুল ওই এলাকায় চাষ হচ্ছে।

    গদখালী ফুলের হাটে দেখা যায়, গ্লাডিউলাস, গোলাপের পাহাড় জমে রয়েছে। পাতলা পলিথিনের আবরণ দিয়ে জড়িয়ে রাখা হয়েছে লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি, মেরুন, গোলাপিসহ হরেক রঙের জারবেরা। হলুদ গাঁদার ¯তূপ পড়ে রয়েছে হাটের কিনারে। নছিমন, করিমন, ভ্যান, পিকআপ, বাসের ছাদে পাইকারি ব্যবসায়ীরা ফুল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে হাটে পাইকারি রজনীগন্ধা বিক্রি হচ্ছে প্রতিশ’ ৪শ থেকে ৫শ টাকা, গ্ল¬াডিউলাস প্রকারভেদে ৭শ থেকে ৯শ, গোলাপ ৮০ থেকে ১শ, গাঁদা প্রতি হাজার ৪০ থেকে ৫০, জারবেরা প্রতিটি ১০ টাকা থেকে ১৫ টাকা।

    ফুলচাষিরা জানান, শীত মৌসুমে বাজার চাঙ্গা থাকে। বর্ষায় বাজার পড়ে যায়। গদখালী, পানিসরা, হাড়িয়া, কৃষ্ণচন্দ্রপুর, কানার আলী, পটুয়াপাড়া, সৈয়দপাড়া, মাটিপুকুর, বাইসা, নারাঙ্গালী গ্রামে দেখা গেছে, শুধুু ফুলের বাগান। এসব গ্রামের বেশিরভাগ জমিতে ফুলের চাষ হচ্ছে। নারী-পুরুষ কৃষিশ্রমিক ফুল ক্ষেতের যতœ করছেন। কেউ ফুল কাটছেন। কেউ ফুলে সার ছিটিয়ে দিচ্ছেন।
    ফুলচাষী আব্দুর রাজ্জাক জানান, তিনি বর্তমানে সবধরনের ফুল মিলিয়ে ১৯ বিঘা জমিতে ফুল চাষ করছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ফুলে ফুলে বাংলাদেশকে রাঙিয়েছি। এখন শহর-গ্রামে ফুল বিক্রি হচ্ছে। মানুষের মধ্যে ফুলের মাধ্যমে আমরা ভালোবাসাকে জাগিয়ে তুলেছি। কিন্তু আমরা ফুলচাষের জন্য সহজ শর্তে ঋণ পাচ্ছি না। পাচ্ছি না কৃষি উপকরণ।

    ’ গদখালী ফুলচাষি ও ফুল ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সহ-সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ফুল বিক্রির জন্য আমাদের স্থায়ী পাইকারি বাজার নেই। ঢাকা শহরের ফুটপাতে ফুটপাতে বিক্রি করতে হয়। চাষিরা চাঁদাবাজির সম্মুখীন হন। ঢাকার গাবতলীর কেন্দ্রীয় কৃষি মার্কেটে ফুলের স্থায়ী বাজারের জন্য আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে জায়গা চেয়েছি। আমরা উন্নতমানের ফুল উৎপাদন করলেও বিদেশ থেকে ফুল আমদানি অব্যাহত রয়েছে। ভালো ফুল ফোটানোর জন্য কৃষকদের উন্নত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। প্রয়োজন রয়েছে একটি গবেষণাগারের।’ এছাড়া, রয়েছে ভালো বীজের অভাব। বীজ সংরক্ষণের বিশেষায়িত হিমাগার নেই। গদখালী ফুলচাষী ও ফুল ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রনি আহমদ বললেন, বর্তমানে দেশের বাজারে ফুলের দাম কম হওয়াতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরকার যদি তাদের ফুল বাইরে রফতানির সুযোগ করে দেয় তাহলে ফুলচাষিদের জীবনে ফুলের সুঘ্রাণ মিলবে।

    যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ মহাপরিচালক শেখ হেমায়েত উদ্দিন বলেন, সরকার যশোরের ফুল চাষীদের জন্য নানা ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে। তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে উন্নত জাতের ফুল চাষেও অণুপ্রাণিত করা হবে বলে তিনি জানান। এ ছাড়া তিনি বলেন, ফুল সংরক্ষণের জন্য একটি ভালো মানের কোল্ড স্টোরেজ দরকার। বাসস

    Thursday, February 11, 2016

    সুর্যমুখী চাষ

  • Share The Gag
  • ফসলের নাম :সূর্যমুখী(Sunflower)

    উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম : Hellianthus annus.
    ১.  পুষ্টিমূল্য/উপাদান : বীজে লিনোলিক এসিড বিদ্যমান। উন্নতমানের তৈল থাকে।
    ২.  ভেষজগুণ : হৃদরোগীদের জন্য সূর্যমুখীর তেল খুবই উপকারী।
    ৩.  ব্যবহার :সূর্যমুখীর খৈল গরু ও মহিষের উৎকৃষ্টমানের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর বীজ ছাড়ানোর পর মাথাগুলো গরুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। গাছ ও পুষ্পস্তবক জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
    ৪.  উপযুক্ত জমি ও মাটি : সূর্যমুখী সাধারণত সব মাটিতেই জন্মে। তবে দো-আঁশ মাটি সবচেয়ে বেশী উপযোগী।
    ৫.  জাত পরিচিতি : এ পর্যন্ত বারি কর্তৃক ২টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। যথা (১) কিরণী (ডিএস-১) এবং বারি সুর্যমুখী-২।

    কিরণী:১৯৯২ সালে জাতটির অনুমোদন দেয়া হয়। বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জাতটি উদ্ভাবন করা হয়। জাতটির কান্ডের ব্যাস ১.৫-২.০ সে.মি.। পরিপক্ক পুষ্পমঞ্জুরী বা শাখার ব্যাস ১২-১৫ সে.মি.। প্রতি মাথায় বীজের সংখ্যা ৪০০-৬০০। বীজের রং কালো। ১০০০ বীজের ওজন ৬৮-৭২ গ্রাম। বীজে তেলের পরিমাণ শতকরা ৪২-৪৪ ভাগ। জাতটি মোটামুটি অলটারনারিয়া বৱাইট রোগ সহনশীল। জীবনকাল ৯০-১১০ দিন। হেক্টর প্রতি ফলন ১.৬ হতে ১.৮ টন।
    বারি সূর্যমুখী-২ : গাছের কান্ডের ব্যাস ২.০-২.৪ সে.মি.। পরিপক্ক পুষ্পমঞ্জুরী বা শাখার ব্যাস ১৫-১৮ সে.মি.। বীজের রং কালো। ১০০০ বীজের ওজন ৬৫-৭০ গ্রাম। প্রতি মাথায় বীজের সংখ্যা ৪৫০-৬৫০। তেলের পরিমাণ শতকরা ৪২-৪৪ ভাগ। জীবনকাল রবি মৌসুমে ৯৫-১০০ দিন এবং খরিফ মৌসুমে ৯০-৯৫ দিন।  হেক্টর প্রতি ফলন রবি মৌসুমে ২.০ হতে ২.৩ টন এবং খরিপ মৌসুমে ১.৫ হতে ১.৮ টন।
    ৬.  বীজের হার : ৮-১০ কেজি/হেক্টর।
    ৭.  বপন সময় ও বপন পদ্ধতি : সূর্যমুখী সারা বছর চাষ করা যায়। তবে অগ্রহায়ন মাসে (মধ্য  থেকে চাষ করলে এর ভালো ফলন পাওয়া যায়। খরিপ-১ মৌসুমে অর্থাৎ জ্যৈষ্ঠে (মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য মে) মাসেও এর চাষ করা যায়। সূর্যমুখী বীজ সারিতে বুনতে হয়। সারি থেকে সারির দূরত্ব ৫০ সে.মি. এবং গাছ থেকে গাছের  দূরত্ব ২৫ সে.মি.।
    ৮.  সার ব্যবস্থাপনা :ভালো ফলনের জন্য সূর্যমুখীতে নিম্নরূপ সার ব্যবহার করতে হবে।

    সারের নাম            সারের পরিমাণ/হেক্টর
    ইউরিয়া                ১৮০-২০০ কেজি
    টিএসপি                 ১৫০-২০০ কেজি
    এমওপি                  ১২০-১৫০ কেজি
    জিপসাম                 ১২০-১৭০ কেজি
    জিংক সালফেট          ৮-১০ কেজি
    বরিক এসিড            ১০-১২ কেজি
    ম্যাগনেসিয়াম সালফেট  ৮০-১০০ কেজি
    * রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ ও রাজশাহী এলাকার জন্য প্রযোজ্য
    সার প্রয়োগ পদ্ধতি :অর্ধেক ইউরিয়া এবং বাকি সব সার শেষ চাষের সময় জমিতে ছিটিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া ২ ভাগ করে প্রথম ভাগ চারা গজানোর ২০-২৫ দিন এবং দ্বিতীয় ভাগ ৪০-৪৫ দিন পর (ফুল ফোটার পূর্বে) প্রয়োগ করতে হবে।
    ৯.  সেচ ও আগাছা ব্যবস্থাপনা :সূর্যমুখী ফসলের ফলন বেশী পেতে হলে কয়েকবার সেচ দেয়া প্রয়োজন। প্রথম সেচ বীজ বপনের ৩০ দিন পর (গাছে ফুল আসার আগে), দ্বিতীয় সেচ বীজ বপনের ৫০ দিন পর (পুষ্পস্তবক তৈরির সময়) এবং তৃতীয় সেচ বীজ বপনের ৭০ দিন পর (বীজ পুষ্ট হবার আগে) সেচ দেয়া দরকার।সূর্যমুখীর জমি সর্বদা আগাছামুক্ত রাখতে হবে। জমিতে আগাছা দেখা দিলে উহা তুলে ফেলতে হবে।
    ১০.  পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা :

    পোকার নাম : বিছা পোকা

    ভূমিকা : ছোট অবস্থায় এরা দলবদ্ধভাবে থাকে।
    পোকা চেনার উপায় : কীড়া বা বিছা হলুদ রংয়ের এবং গায়ে কাঁটা থাকে।
    ক্ষতির নমুনা : এরা সাধারণত গাছের পাতায় আক্রমণ করে। এ পোকার কীড়া দলবদ্ধভাবে থেকে পাতার সবুজ অংশ খেয়ে পাতাকে পাতলা সাদা পর্দার মতো করে ফেলে।
    অনুকূল পরিবেশ :উষ্ণ আবহাওয়া।
    ব্যবস্থাপনা : mn পোকা দেখার সংগে সংগে গাছ থেকে পোকাসহ পাতা সংগ্রহ করে পোকা মেরে ফেলতে হবে। সেচ নালায় কেরোসিন মিশ্রিত পানি থাকলে কীড়া পানিতে পড়ে মারা যায়।

    প্রতি লিটার পানিতে ডায়াজিনন-৬০ ইসি ২ মিলি হারে মিশিয়ে বিকালে জমিতে স্প্রে করতে হবে।
    ১১.  রোগ ব্যবস্থাপনা :

    রোগের নাম :পাতা ঝলসানো রোগ
    ক্ষতির নমুনা : অলটারনেরিয়াহেলিয়ানথী নামক ছত্রাকের সাহায্যে এ রোগ ছড়ায়। আক্রমণের শুরুতে পাতায় ধুসর বা গাঢ় বাদামী বর্ণের অসম আকৃতির দাগ পড়ে। এ দাগগুলো একত্রে মিলিত হয়ে বড় দাগের সৃষ্টি করে এবং অবশেষে পুরো পাতা ঝলসে যায়।

    বিস্তার : বীজ এবং বায়ুর সাহায্যে বিস্তার লাভ করে।
    ব্যবস্থাপনা : কিরণী জাতের চাষ করা
    প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম রোভরাল-৫০ ডব্লিউ পি মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ৩ বার সেপ্র করা বা ফসল কাটার পর পরিত্যক্ত কান্ড, মূল ও পাতা পুড়িয়ে ফেলা।
    ১২.  ফসল তোলা : ৯০-১১০ দিনের মধ্যে ফসল তোলা যায়।

    কালীগঞ্জে ফুল চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে

  • Share The Gag
  • ফুল ছাড়া কি প্রিয় মানুষকে হৃদয়ের জমে থাকা ভালোবাসার কথা ব্যক্ত করা যায়! হৃদয়ে জমে থাকা সেই ভালোবাসা ফুল ছাড়া যেন অসম্পন্নই থেকে যায়। প্রিয় মানুষটিকে মূল্যবান কোনো উপহার দিতে পারুক আর নাই পারুক ছোট্ট একটি ফুল তুলে দিয়ে প্রকাশ করতে পারে হৃদয়ের গভীর ভালোবাসার কথা। তাইতো ভালোবাসা প্রকাশের মহামূল্যবান ফুলটি দেশের অগণিত তরুণ-তরুণীসহ সকল বয়সের মানুষের হাতে তুলে দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন ঝিনাইদহের ফুলকন্যারা। প্রতিবছর বসন্ত বরণ, ভালবাসা দিবস, বাংলা ও ইংরেজি নববর্ষ, স্বাধীনতা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মতো দিনগুলোতে ফুলের অতিরিক্ত চাহিদা থাকে। আর এই চাহিদার সিংহভাগ যোগান দিয়ে থাকে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ফুল চাষিরা। যার কারনে দিন দিন কালীগঞ্জে ফুল চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

    বিশেষ করে কালীগঞ্জ উপজেলার ১২টি গ্রামের ২৩৮ একর জমিতে এখন চাষ হচ্ছে গাঁদা, রজনীগন্ধ্যা, গোলাপ ও গ্লাডিয়াসসহ নানা জাতের ফুল। মাঠের পর মাঠ হলুদ গাদা ফুলের দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। বিশ্ব ভালবাসা দিবস উপলক্ষে এ জেলার ফুলচাষীরা কয়েক কোটি টাকার ফুল বিক্রির টার্গেট নিয়েছে।

    এসব ফুল ক্ষেত থেকে সংগ্রহ ও মালা গাঁথা থেকে শুরু করে বিক্রি করা পর্যন্ত এই এলাকার মেয়েরা করে থাকে। ফলে পুরুষের পাশাপাশি মেয়েদেরও কর্মসংস্থান হচ্ছে। এ এলাকার উৎপাদিত ফুল প্রতিদিন দূরপাল্লার পরিবহনে চলে যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে। জাতীয় ও বিশেষ দিনগুলো ছাড়াও সারাবছর এ অঞ্চলের উৎপাদিত ফুল সারাদেশের চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখে।
    কথা হয় জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ছোট্র একটি গ্রাম ডুমুর তলার চাষী মশিয়ার রহমানের সাথে। তিনি জানান, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ফুল চাষ দেখে তিনি কৃষি বিভাগের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে ২০ শতক জমিতে গাদা ফুল চাষ করেছেন। বাংলা আশ্বিন মাসে চারা গালানোর পর ৩৫ থেকে ৪৫ দিনের মাথায় ফুল এসেছে। গত এক সপ্তাহে তিনি ১০ হাজার টাকা ফুলও বিক্রি করেছেন। সার,কীটনাশক,পরিচর্যা বাবদ তার খরচ হয়েছে ১০ হাজার টাকা। এই ২০ শতক জমি থেকে তিনি ৫০ হাজার টাকার ফুল বিক্রি করতে পারবেন বলে জানান। এতে তার লাভ থাকবে ৪০ হাজার টাকা।

    এছাড়া এই গাছ যতœ করে রাখলে বিভিন্ন সময়ে ফুল তুলতে পারবেন। তিনি আরো জানান, দড়িতে ফুল গেথে ঝোপা তৈরি করা হয়। এক ঝোপায় সাড়ে ৬শ থেকে ৭শ গাদা ফুল থাকে। ফুলের মূল্য কম থাকলে এক ঝোপা বিক্রি হয় ৩০ টাকায়। দাম বাড়লে সর্বোচ্চ ৭শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে পারেন। আরেক চাষী মোহাম্মদ আলী জানান, তিনি আগাম গাদা ফুল চাষ করে মাত্র ১১ শতক জমি থেকে ৬০ হাজার টাকার ফুল বিক্রি করেছেন। এছাড়া একই গ্রামের মহাসিন, আতিয়ার ও মিজানুর রহমানও তাদের জমিতে ফুল চাষ করেছেন।

    ফুলনগরী বলে খ্যাত বড়ঘিঘাটি গ্রামের ফুলকন্যা নাজমা, নুরজাহান, স্বরসতী ও আয়েশা বেগমের জানান, বছরের বারো মাসই ফুল তোলার কাজ করেন তারা। কিন্তু বিশেষ বিশেষ দিন সামনে রেখে কাজ বেশি করতে হয়। আয় উপার্জন ও বেশি হয়। তারা জানান, এখন ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে সকাল বিকাল কাজ করতে হচ্ছে। ব্যপারীরা ফুল নিতে ফুল মালিকের বাড়ি বসে থাকছে। যে কারণে সব কিছু রেখে সারাদিন ফুল তুলছেন তারা।

    তারা আরও জানান, প্রতি ঝোপা ফুল তুলে গেঁথে দিলে ফুল মালিক ১০ টাকা করে দেয়। প্রতিদিন তারা ১২ থেকে ১৮ ঝোপা ফুল তুলতে পারে। অনেকে আবার স্থানীয় এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে একটি বাড়ির কাজ ও গৃহপালিত পশু কেনে। এরপর ফুলের কাজ করে কিস্তির টাকা পরিশোধ করি। এভাবেই এ এলাকার প্রায় প্রতি বাড়ির নারীরা এই কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যে কারণে এই এলাকার মানুষ দিনে দিনে এখন বেশ স্বচ্ছল হয়ে উঠছেন।

    উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান জানান, শুধুমাত্র কালীগঞ্জ উপজেলায়ই ২৩৮ একর জমিতে ফুল চাষ হচ্ছে। এছাড়া জেলার প্রায় ৫ শত হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে গ্লাডিয়াস, রজনীগন্ধ্যা গোলাপ, গাঁদাসহ নানা জাতের ফুল। উৎপাদন ব্যয় কম, আবার লাভ বেশি হওয়ায় কৃষকরা ফুল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। কালীগঞ্জ উপজেলার কামালহাট, খড়িকাডাঙ্গা, দৌলতপুর, কাদিরডাঙ্গা, বিনোদপুর, খালকোলা, বালিয়াডাঙ্গা, দাদপুর, ধলা, গোপিনাথপুর, ডুমুরতলা,বালিয়াডাঙ্গা, তিল্লা, সিমলা, রোকনপুর, গোবরডাঙ্গা, পাতবিলা, পাইকপাড়া, তেলকূপ, গুটিয়ানী, সদর উপজেলার গান্নাসহ বিভিন্ন গ্রামের মাঠে ফুল চাষ করা হয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি গাধা ফুল চাষ হয় কালীগঞ্জ উপজেলার কামালহাট গ্রামে।
    সরেজমিনে বালিয়াডাঙ্গা বাজার ও কালীগঞ্জের মেইন বাসস্ট্যান্ডে দেখা যায়, দুপুর থেকে শত শত কৃষক তাদের ক্ষেতের উৎপাদিত ফুল ভ্যান, স্কুটার ও ইঞ্জিনচালিত বিভিন্ন পরিবহন যোগে নিয়ে আসছেন। বেলা গড়ানোর সাথে সাথে বালিয়াডাঙ্গা বাজার ও কালীগঞ্জ মেইন বাসস্ট্যা- ভরে যায় লাল, সাদা আর হলুদ ফুলে ফুলে।

    সারাদেশের আড়তগুলোতে ফুল পাঠাতে আসা একাধিক ফুলচাষিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সারা বছরই তারা ফুল বিক্রি করে থাকেন। তবে প্রতিবছর বাংলা ও ইংরেজি নববর্ষের দিন, স্বাধীনতা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ভালবাসা দিবস প্রভৃতি দিনগুলোতে ফুলের অতিরিক্ত চাহিদা থাকে। এ সময় দামও থাকে ভালো। ফুলচাষিরা নিজেরা না এসে সারা বছর তাদের ক্ষেতের ফুল চুক্তি মোতাবেক ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বড় বড় শহরের ফুলের আড়তে পাঠিয়ে দেন। এ সকল স্থানের আড়তদারেরা বিক্রির পর তাদের কমিশন রেখে বাকি টাকা পাঠিয়ে দেন। ফলে ফুল চাষিদের টাকা খরচ করে ফুল বিক্রির জন্য কোথাও যাওয়া লাগেনা। তারা মোবাইল বা ফোনালাপের মাধ্যমে বাজার দর ঠিকঠাক করে ফুল পাঠিয়ে থাকেন বলেও জানান কৃষকরা।

    দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখলেও দ্রুত পঁচনশীল এ ফসল সংরক্ষণের জন্য নেই কোনো ব্যবস্থা। ফলে যখন বাজারে যোগান বৃদ্ধির কারণে হঠাৎ দাম কমে যায় তখন লোকসানে বিক্রি করা ছাড়া উপায় থাকে না ফুলচাষিদের। ফলে কৃষকেরা বঞ্চিত হন ন্যায্যমূল্য থেকে।

    বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের ফুলচাষি সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক জানান, ১৯৯১ সালে এ এলাকায় সর্বপ্রথম ফুল চাষ করেন বালিয়াডাঙ্গার ছব্দুল শেখ। তিনি ওই বছর মাত্র ১৭ শতক জমিতে ফুল চাষ করে স্থানীয় বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান ও জাতীয় দিবসগুলোতে ক্ষেত থেকেই বিক্রি করে প্রায় ৩৪ হাজার টাকা লাভ করেছিলেন। এরপর থেকে এ চাষ বিস্তার লাভ করতে থাকে। ধান পাট সবজি প্রভৃতি ফসলের চাষ করে উৎপাদন ব্যয় বাদ দিলে খুব বেশি একটা লাভ থাকে না। কিন্তু ফুল চাষ করলে আবহাওয়া যদি অনুকূলে থাকে তাহলে যাবতীয় খরচ বাদে প্রতি বিঘায় ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লাভ করা সম্ভব। ফলে দিন যত যাচ্ছে এ অঞ্চলে বৃদ্ধি পাচ্ছে ফুল চাষ।

    স্থানীয় ফুলচাষি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান জানান, এলাকার কৃষকরা কষ্ট ফুল উৎপাদন করলেই প্রায়ই তারা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। মধ্যভোগী ব্যবসায়ীরা কম দামে কিনে অনেক লাভবান হয়। কিন্তু ফুল সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে কৃষকরা কম দামে তাদের হাতে ফুল তুলে দেয়।