Showing posts with label নিরাপদ খাদ্য. Show all posts
Showing posts with label নিরাপদ খাদ্য. Show all posts

Wednesday, July 19, 2017

দেশি ডিম কেন খাবেন? এবং ডিমের ৭টি বিস্ময়কর উপকারিতা

  • Share The Gag

  • দেশি মুরগির ডিম








    ভালো ভাবে বিবেচনা করলে বোঝা যাবে যে দেশি মুরগির ডিম আর ফার্মের মুরগির ডিম এর মাঝে তেমন পুষ্টি গত কোন পার্থক্য নেই , তবে সামান্য কিছু পার্থক্য থাকতে পারে । আমাদের দেশে সাধারণত দেশি মুরগী ছেড়ে দেয়া অবস্তায় পালন করা হয় , এজন্য এরা বাহিরে থেকে নানা রকম পোকা – মাকড় ,গাছের কচি পাতা ,কেঁচো,ইত্যাদি খায় এর জন্য দেশি মুরগীর ডিম পুষ্টি হয় । আবার অন্য দিকে ফার্মের মুরগীকে মাঝে মাঝে নানা রকম ভিটামিন খাবারের সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়, সে সব খাবারে থাকে নানা রকম খনিজ পদাথ – শামুকের গুড়া ,খৈল,লবণ ,শুটকি মাছের গুড়া, ভুষি ,গম, ভুট্টা আরও অনেক কিছুর সং মিশ্রণের ফলে যে খাবের হয় তা ফার্মের মুরগিকে দেয়া হয় যার কারণে ফার্মের মুরগীর ডিমও পুষ্টিকর হয় । আবার দেশী মুরগীর তুলনায় ফার্মের মুরগীর ডিম আকারে বেশী বড় হয় , এ সব দিক বিবেচনা করলে ফার্মের মুরগীর ডিমেই বেশি পুষ্টি থাকে ।


    দেশি ডিম কেন খাবেন?


    তবে ফার্মের ডিমের তুলনায় দেশি মুুরগীর ডিম অধিক পুষ্টি সম্পন্ন হয়ে থাকে। দেশি মুরগীর ডিমের বিশেষ বৈশিষ্ট হলো এটি প্রাকৃতিক ভাবে উৎপাদিত, যাতে ক্ষতিকর কোন চর্বি থাকে না।

    এ কথা হলফ করে বলা যায় যে, ডিম খাওয়ার কথা উঠলে আমাদের দেশের অধিকাংশ লোকজন মুরগির ডিম-ই বেছে  নেবেন। বিশেষ করে হাঁসের ডিমের সঙ্গে যদি তুলনা করা যায় তাহলে মুরগির ডিম-ই বেশি পছন্দ। এর কারণ, প্রচলিত ধারণা হচ্ছে মুরগির ডিমে বেশি পুষ্টি থাকে।

    আজকাল অনেকেই ডিম খান না। কেউ ওজন বেড়ে যাওয়ার ভয়ে, কেউ আবার রক্তে চর্বির পরিমান কম রাখতে, কেউ আবার হৃদরোগকে ভয় পেয়ে। কিন্তু আসলেই কি ডিম এগুলো বাড়ায়? বরং চিকিৎসকেরা আজকাল বলেন উল্টো কথা। তারা বলেন , সকালে নাস্তায় একটি ডিম মাসে প্রায় ৩ পাউন্ড পর্যন্ত ওজন কমাতে পারে।

    সহজলভ্য পুষ্টির উত্স হিসেবে ডিমের তুলনা কেবল ডিমই হতে পারে। তাই বাড়িতে বা রেস্তোরাঁয় সকাল-বিকেলের নাশতাতেই হোক কিংবা দুপুর-রাতের খাবারে ডিমের একটা মেন্যু ঘুরেফিরে আসেই। আর ব্যাচেলরদের জীবনে সহজে রান্নার সহজ মেন্যু হিসেবে ডিম তো প্রায় ‘জাতীয় খাদ্য’ই বটে!

    ডিমের কুসুম ভিটামিন-এ ও ভিটামিন-বি-এর খুবই ভালো উত্স। ভিটামিন-এ ত্বকের জন্য ভালো। ভিটামিন-বি শরীরে শক্তি জোগায়, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এবং মাংসপেশির গঠনে সহায়ক। এ ছাড়া গর্ভধারণের জন্যও ডিমের কুসুম খাওয়া উপকারী। ডিমের কুসুমে থাকা স্যাচুরেটেড ফ্যাট শরীরে প্রয়োজনীয় হরমোনের উত্পাদন প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে এবং শরীরে ভিটামিন ও মিনারেল ধারণ করার ক্ষমতা বাড়ায়।


     

     

     

    ডিমের ৭টি বিস্ময়কর উপকারিতা:


    সবারই পছন্দের খাবার হল ডিম। সকালের নাস্তায় ডিম ছাড়া যেন নাস্তাই করা হয় না। পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ডিম খেতে ভালবাসেন না এমন মানুষ খুব কমই আছে। ডিম সেদ্ধ, ডিম পোঁচ, অথবা ডিম দিয়ে যে কোন রান্না খুবই জনপ্রিয় বিশ্বজুড়ে।

    আপনি হয়তো জানেন যে ডিম আমাদের দেহের জন্য অনেক বেশি উপকারী, কিন্তু কীভাবে আপনার উপকার করে এই ডিম? জেনে নিই উপকারিতা গুলো সম্পর্কে।

    মস্তিষ্কের জন্য উপকারিঃ

    ডিমে আছে প্রচুর পরিমানে কলিন যা নিউরোট্র্রান্সমিটার হিসেবে কাজ করে আমাদের দেহকে সুস্থ রাখে। ডিম আমাদের মস্তিষ্কের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে থাকে। তাছাড়া ডিমের কুসুমে আছে ফলেট উপাদান যা আমাদের মস্তিষ্কের ভিতরে স্নায়ু কোষের রক্ষণাবেক্ষণ করে।

    দেহের হাড় মজবুত করেঃ

    ডিমে আছে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন ডি যা আমাদের দেহের ক্যালসিয়ামের অভাব পূরণ করে থাকে এবং ডিমে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের উপস্থিতি অস্টিওপরোসিস বন্ধ রাখে এবং দেহের হাড় মজবুত হতে সাহায্য করে।

    দেহের ওজন নিয়ন্ত্রন করেঃ

    আমাদের দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণে ডিমের উপকারিতা অনেক। যারা পেশির ওজন বৃদ্ধি করতে চান তাদের জন্য প্রোটিন সমৃদ্ধ ডিম উপযুক্ত। গবেষণায় দেখা গেছে যে ডিম আমাদের দেহে ঘন ঘন ক্ষুধা লাগাকে কমিয়ে দিয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে।

    নখ ও চুলের স্বাস্থ্য উন্নত করঃ

    ডিমে আছে সালফার সমৃদ্ধ অ্যামিনো অ্যাসিড যা আমাদের হাতের নখের স্বাস্থ্যই শুধু উন্নত করেনা আমাদের চুলের স্বাস্থ্য মজবুত করে ও আকর্ষণীয় করে তুলে। ডিমের অন্যান্য খনিজ পদার্থ সেলেনিয়াম, আয়রন ও জিঙ্ক দেহের নখ ও চুলের স্বাস্থ্য রক্ষার্থে সহযোগীতা করে।

    দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি করেঃ

    ডিমের অবস্থিত লুটিন ও যেক্সানথিন এই দুটি ক্যারটিনয়েড আমাদের চোখের সুস্থ দৃষ্টি নির্ধারণে সাহায্য করে। ডিমের এই উপাদান গুলো আমাদের চোখের ছানি, মেকুলার পতন ও সূর্যের বেগুনী রশ্মি থেকে আমাদের চোখকে রক্ষা করে।

    স্তনের ক্যানসার রোধ করেঃ

    গবেষণার পরামর্শ অনুযায়ী বলা হয়েছে যে প্রতি সপ্তাহে ৬ টি করে ডিম খেলে স্তনে ক্যানসার হওয়ার সম্ভবনা ৪০% কমে যায়।

    ডিম সহজেই হজম হয়ঃ

    ডিম খুব দ্রুত হজম হয়ে যায় আমাদের দেহে। ডিম আপনি যেভাবেই খান না কেন এটি আমাদের দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

    Monday, July 3, 2017

    পুষ্টির চাহিদা মেটাতে পোকার চাষ!

  • Share The Gag
  • পুষ্টির চাহিদা মেটাতে পোকার চাষ!



    নিত্য নতুন খাবার আবিষ্কার হচ্ছে, কিন্তু সেসব খাবারে প্রকৃত পুষ্টি পাচ্ছে না মানুষ। তাই বিজ্ঞানীরা বলছেন, খুব শিগগিরই ইউরোপে পোকা চাষের ফার্ম চালু হবে। পোকা ছাড়া কোনোভাবেই পুষ্টির চাহিদা পূরণ হওয়া সম্ভব নয়। কারণ, শুককীট বা ল্যাদা পোকায় প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন আছে, যা মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটাবে।

    জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যানুসারে ২০০০ সালে মাংস বা প্রোটিনের চাহিদা যা ছিল, তা থেকে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রায় ৭২ ভাগ বেড়ে যাবে। আর তখন প্রোটিনের চাহিদা পূরণে হিমসিম খেতে হবে মানুষকে। বর্তমানে পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে বিভিন্ন প্রাণীর মাংস খাই আমরা। কিন্তু তথন এমন পরিস্তিতি সৃষ্টি হবে যে প্রাণীর মাংসেও পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। তাই বাধ্য হয়েই পোকা মাকড়ের উপর নির্ভরশীল হবে মানুষ।

    ২০১৩ সালেও জাতিসংঘ থেকে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনেও টেকশই পুষ্টি চাহিদা পূরণের জন্য পোকা চাষের প্রতি ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘাস ফড়িং, পিঁপড়া ও অন্যান্য পোকামাকড় চাষ করে পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। তবে পোকা চাষের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। যেসব পোকামাকড় পরিবেশের ক্ষতি করে না সেগুলো চাষ করতে হবে। আর এদিকে অন্যান্য প্রোটিনের উৎস যেমন মাছ ও মাংসও সচল রাখতে হবে।

    গত বছরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও এক প্রতিবেদনে ক্রমবর্ধমান পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে পোকা চাষের ব্যাপারে উৎসাহিত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পুষ্টির চাহিদা পূরণের জন্য পোকা খাওয়ার বিষয়টি এলিয়েন কালচার মনে হলেও এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার প্রায় ২ মিলিয়ন মানুষের প্রধান প্রোটিনের উৎস এই পোকামাকড়। এই পোকামাকড়গুলোর মধ্যে শুঁয়োপোকা, উইপোকা, ঘাস ফড়িং, ঝিঁঝিঁ, অরুচিকর বাগ এবং অন্যান্য পোকামাকড় খুব জনপ্রিয়। কিন্তু এসব পোকামাকড় সেখানে কোনো ফার্মে চাষ হয় না। ওইসব অঞ্চলের মানুষ প্রাকৃতিকভাবে পোকা সংগ্রহ করে খায়।’

    ইউরোপে এখন যে পোকামাকড়ের ব্যবহার হয় না তা কিন্তু নয়। তবে মানুষের খাবার হিসেবে ব্যবহার হয় কমই। সাধারণত বাসার পোষা প্রাণীর জন্য তারা এসব পোকা কেনেন এবং সেগুলোকে পোষেন। তবে যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে তাতে এবার মানুষের খাবারের জন্য পোকার চাষ শুরু হবে। এবং এটি মাছ ও মাংসের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হবে। তার মধ্যে শুককীট, বা উড়ন্ত পোকা খুবই উপযুক্ত বিকল্প হিসেবে মনে করছেন গবেষকরা।



    ইতিমধ্যেই ইউরোপিয়ান কমিশন ‘প্রোটইনসেক্ট’ নামের এক প্রজেক্ট চালু করেছে। এই প্রজেক্টের কাজ হলো কোন কোন প্রাণী বা পোকা মানুষের পুষ্টির জন্য বেশি উপযোগী ও পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না, তা গবেষণা করে বের করা।

    ‘প্রোটইনসেক্ট’ ও ‘মিনেভরা কমিউনিকেশন ইউকে’ এক সাথে কাজ করছে। মিনেভরা কমিউনিকেশনের এক মুখপাত্র বলেন, ‘ইউরোপের নীতিমালায় কোন পোকামাকড় খাওয়া বা পালন করার ব্যাপারে আইন আছে। তবে সম্প্রতি পোকা চাষের যে কথা উঠেছে তাকে আমরা খুবই উদ্বিঘ্ন। কারণ আবার সব নীতিমালা পরিবর্তন করতে হবে। কোন কোন পোকা ফার্মে চাষ করা যাবে আর কোনগুলো যাবে না তা নির্ধারণ করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।’

    তবে পোকা চাষের ব্যাপারে সবচেয়ে যে বিষয় নিয়ে সবাই সবচেয়ে উদ্বিগ্ন তা হলো- মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি। কারণ, এখনও অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, কিছু পোকা আছে যেগুলো মানুষের খাওয়া ‍উচিত নয়। সেগুলো মানুষের পাকস্থলী হজম করতে পারবে না, বা স্বাস্থ্যের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

    তবে ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ (ইএফএসএ) এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছে। তারা বলছেন, অন্যান্য প্রাণীর মাংস যেভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হয়, ঠিক সেভাবেই পোকা প্রক্রিয়াজাত করা হবে। সুতরাং এখানে ক্ষতির কোনো সম্ভাবনা নেই। আর মানুষের পুষ্টির চাহিদাও পূরণ হবে।

    তাই ইউরোপিয়ান কমিশন তাদের ‘প্রোটইনসেক্ট’ প্রোজেক্টের ডাটা-গুলি আবার যাচাইবাছাই করছে। ডাটা-গুলির উপর নির্ভর করবে কত তাড়াতাড়ি আবার পোকার ফার্ম চালু করা যায়। যদি তারা মনে করেন, পোকা চাষ করা সম্ভব- তাহলে খুব শিগগিরই পোকা চাষের ফার্ম চালু করা হবে।

    Saturday, July 1, 2017

    বহুগুণে গুণান্বিত কাসাভা চাষ

  • Share The Gag
  • বহুগুণে গুণান্বিত কাসাভা চাষ

    আফ্রিকা মহাদেশের বেশির ভাগ মানুষ কাসাভা খেয়ে জীবন ধারণ করে। তবে বাংলাদেশে এখনো এটি নিতান্তই অপরিচিত। গুল্মজাতীয় এ উদ্ভিদটি বাংলাদেশে চাষ না হলেও পাহাড়ে-জঙ্গলে দীর্ঘদিন থেকে এ গাছ জন্মায়। স্থানীয়ভাবে কাসাভার ব্যবহার আছে অনেক আগে থেকেই। গ্রামের মানুষ কাসাভার কন্দকে ‘শিমুল আলু’ বলে। গাছটির পাতা অনেকটা শিমুল গাছের মতো দেখতে বলেই হয়তো এরকম নামকরণ।

    পুষ্টিগুণ

    কাসাভা আটার পুষ্টিগুণ গমের আটার চেয়ে অনেক বেশি। এই আটা থেকে রুটি ছাড়াও অনেক প্রকার সুস্বাদু খাবার তৈরি করা যায়। কাসাভা ভিটামিনের দিক দিয়েও শীর্ষে। কাসাভার খাদ্যমানের মধ্যে প্রোটিন আছে ১০ শতাংশেরও বেশি। অ্যামাইনো অ্যাসিড ও কার্বোহাইড্রেট আছে যথাক্রমে ১০ ও ৩০ শতাংশ। আরো আছে ফ্রুকটোজ ও গ্লুকোজ। খাদ্যোপযোগী প্রতি ১০০ গ্রাম কাসাভা আলুতে রয়েছে ৩৭ গ্রাম শর্করা, ১.২ গ্রাম আমিষ, ০.৩ গ্রাম চর্বি, ৩৫ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ০.৭ মিলিগ্রাম আয়রন, ০.০৯ মিলিগ্রাম ভিটামিন এ, ৩৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি এবং ১৪৬ ক্যালরি খাদ্যশক্তি।

    রোগ প্রতিরোধ

    সব পুষ্টিগুণ মিলে সেলুলোজের সঙ্গে পাওয়া যাবে মিনারেল ও ফাইবার গ্লুটামিন। এর আঠালো অংশ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ উপশমের ক্ষেত্রে কাজ করে। কাসাভা ফাইবার বাড়তি কোলেস্টরলের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করে। এমনকি এটি ক্যান্সার প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখে।

    বাজারজাত

    সঠিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে কাসাভা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ইতোমধ্যে বেসরকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাসাভা থেকে আটা ও স্টার্চ তৈরি করে বাজারজাতকরণের উদ্যোগে নিয়েছে।

    প্রক্রিয়াজাত

    কাসাভা আলুকে প্রক্রিয়াজাত করে তা থেকে আটা ও স্টার্চ পাওয়া যায়। এই আটা দিয়ে রুটি থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাবার পাওয়া সম্ভব। প্রতি কেজি আলু থেকে আটা ও স্টার্চ মিলিয়ে প্রায় ৩৪০ গ্রাম পর্যন্ত উৎপাদন করা সম্ভব। এক হেক্টর জমি থেকে বছরে প্রায় ২৫.৫ মেট্রিক টন অর্থাৎ ৩ হাজার ৪০০ কেজি কাসাভা আটা ও স্টার্চ পাওয়া সম্ভব।

    খাদ্যসামগ্রী
    কাসাভার আটা দিয়ে রুটি ছাড়াও পাঁপর, চিপস, নুডলস, ক্র্যাকার্স, বিস্কুট, কেক, পাউরুটি ইত্যাদি তৈরি করা যায়। কাসাভা আলু যেমন সিদ্ধ করে খাওয়া যায়, তেমনই তরকারি করে মাছ-মাংসের সঙ্গে খাওয়া যায়।



    কোথায় চাষ হয় :

    পৃথিবীর উৎপন্ন কাসাভার ৬০ ভাগ মানুষের খাদ্য, ২৫ ভাগ পশুখাদ্য এবং বাকিটা স্টার্চ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। আফ্রিকায় ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় এ ফসল মানুষের খাবারের অন্যতম প্রধান উপাদান। দক্ষিণ আমেরিকায় মানুষের পাশাপাশি গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবেও কাসাভা ব্যবহৃত হয়। আফ্রিকার নাইজেরিয়া, উগান্ডা, তানজানিয়া, মোজাম্বিক, ঘানা ও জায়ারে সবচেয়ে বেশি কাসাভা চাষ হয়। এশিয়ায় চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতে কাসাভার চাষ হয়। এসব জায়গায় মানুষের খাবারের পাশাপাশি স্টার্চ কারখানার কাঁচামাল হিসেবে কাসাভার ব্যবহার বেশি লক্ষ্য করা যায়।

    এলো কোথা থেকে :

    প্রায় ৭ হাজার বছর আগে কলম্বিয়া ও ভেনিজুয়েলায় কাসাভা চাষের ইতিহাস জানা যায়। তাই দক্ষিণ আমেরিকাকেই কাসাভার উৎপত্তিস্থল হিসেবে মনে করা হয়। পনের শতকে স্প্যানিশ বসতি স্থাপনকারীদের দ্বারা মধ্য আমেরিকায় এর চাষ সম্প্রসারিত হয়। ষোল শতকের শেষের দিকে পর্তুগিজরা কাসাভা আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে নিয়ে আসে। এশিয়ায় প্রথম ফিলিপাইনে স্প্যানিশরা মেক্সিকো থেকে কাসাভা নিয়ে আসে, যা পরে অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আঠারো শতকের শুরুতে পর্তুগিজদের দ্বারা ভারতে কাসাভার আগমন ঘটে। জানা যায়, বাংলাদেশে উনিশ শতকের মাঝামাঝি জনৈক খ্রিস্টান মিশনারির মাধ্যমে মধুপুর অঞ্চলে প্রথম কাসাভা চাষ করা হয়।

    জাত :

    কাসাভার অনেক প্রচলিত ও উন্নত জাত রয়েছে। কৃষকরা খাবার ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে জাত নির্বাচন করে। খাবারের জন্য অনেক অঞ্চলে মিষ্টি জাতের কাসাভা চাষ করা হয়। ভারতে কাসাভার জনপ্রিয় হাইব্রিড জাতগুলো হলো গ-৪, ঐ-৯৭, ঐ-১৬৫, ঐ-২২৬, ঐ-১৬৮৭, ঐ-২৩০৪, ঝ-৮৫৬। ইন্দোনেশিয়ায় অউওজঅ-১, ২, ৩, ৪; থাইল্যান্ডে জঅণঙঘএ-১, ২, ৩, ৬০; ফিলিপাইনে চজ-ঈ ১৩, ২৪, ৬২ এবং চীনে ঝঈ-২০১, ২০৫, ১২৪ জাতগুলো জনপ্রিয়। নাইজেরিয়ায় ঞগঝ-৩০০১, ৩০৫৭২, ৫০৩৯৫, ৩০৫৫৫ এবং কলম্বিয়ায় গ.ঈড়ষ.-২২১৫, ১৬৮৪, গ.ইজঅ-৫, ১২ জাতগুলো উল্লেখযোগ্য।

    চাষের যত নিয়মকানুন :

    মাটি : উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল কাসাভা চাষের উপযোগী। অনুর্বর পাহাড়ি মাটি কিংবা বালিমাটি যেখানে অন্য কোনো ফসল ফলানো যায় না সেখানেও কাসাভা চাষ করা যায়। তবে এ ফসল জলাবদ্ধতা ও উচ্চ লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে না।
    জলবায়ু : এটি একটি খরাসহনশীল ফসল। যেখানে ছয় মাস পর্যন্ত খরা বা শুষ্ক অবস্থা বিরাজ করে সেখানেও কাসাভা সহজে চাষ করা যায়। তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নিচে কাসাভা ভালো হয় না। উপযুক্ত তাপমাত্রা ২৫-৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ৩০০ মিটার ওপরেও কাসাভা চাষ করা যায়।

    বংশবৃদ্ধি :

    গাছ লাগানোর জন্য বীজ কিংবা কাটিং উভয়ই ব্যবহার করা যায়। বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য পরিপক্ব কা-ের কাটিং ব্যবহার করা হয়। কাসাভা সংগ্রহের সময় সুস্থ, সবল ও রোগমুক্ত কা-গুলো কেটে পরবর্তী বছর লাগানোর জন্য ছায়াযুক্ত স্থানে সংরক্ষণ করতে হয়। লাগানোর সময় কা-কে ১৫-২০ সেমি করে কেটে সোজা করে লাগাতে হবে। প্রতিটি কাটিংয়ে কমপক্ষে ৫ থেকে ৭টি নোড থাকতে হবে।

    জমি তৈরি :

    সাধারণত জমিতে চাষের প্রয়োজন হয় না। তবে বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য জমি চাষ করা যেতে পারে। অধিকাংশ জায়গায় পিট তৈরি করে কাসাভার কাটিং বা সেট লাগানো হয়। পাহাড়ি এলাকায় এটি একটি সহজ ও সুবিধাজনক পদ্ধতি। তবে পিটগুলো মাটি থেকে একটু ওপরের দিকে উঠানো হলে ফলন ভালো পাওয়া যায়।

    লাগানোর নিয়ম :

    প্রতি হেক্টর জমিতে ১০ হাজার গাছ লাগানো যায়। একটি গাছ থেকে অন্য গাছের দূরত্ব ৭৫ থেকে ৯০ সেমি রাখতে হবে। কাটিং মাটিতে লাগানোর সময় ২০ সেমি মাটির নিচে এবং ৫ সেমি মাটির ওপরে থাকতে হবে। সাধারণত ১৫-২০ দিনের মধ্যে কাটিং থেকে নতুন কুশি বের হয়। যেসব কাটিং থেকে কুশি বের হবে না সেগুলো তুলে ফেলে সেখানে ৪০ সেমি আকারের নতুন কাটিং লাগাতে হবে।


    লাগানোর সময়


    সারা বছরই গাছ লাগানো যায়। তবে সাধারণত বর্ষার শুরুতে কাসাভার কাটিং লাগানো ভালো। আমাদের দেশে এপ্রিল-মে মাস কাসাভা লাগানোর সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
    সার ব্যবস্থাপনা : তেমন কোনো সার প্রয়োগ করতে হয় না। তবে বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য হেক্টরপ্রতি ১৮০-২০০ কেজি নাইট্রোজেন, ১৫-২২ কেজি ফসফরাস ও ১৪০-১৬০ কেজি পটাসিয়াম প্রয়োগ করলে সর্বাধিক ফলন পাওয়া যায়।



    সেচ :

    সাধারণত সেচের প্রয়োজন হয় না। তবে কাটিং লাগানোর পর গাছ গজানোর জন্য ৩-৫ দিন অন্তর কমপক্ষে দুবার সেচ দিতে হবে। দীর্ঘদিন খরা অবস্থা বিরাজ করলে হালকা সেচের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে ফলন বৃদ্ধি পায়।

    আন্তঃপরিচর্যা :

    গাছ লাগানোর পর এক মাস অন্তর গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করে গোড়ায় মাটি তুলে দিলে ফলন ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। যদিও কাসাভায় রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ খুবই কম তথাপিও এক ধরনের মাকড়ের আক্রমণে অনেক সময় ফসলের ক্ষতি হয়। সব সময় রোগবালাই ও পোকামাকড় মুক্ত কাটিং লাগাতে হবে এবং মাকড়ের আক্রমণ থেকে ফসলকে রক্ষা করতে হলে আক্রমণ দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাকড়নাশক স্প্রে করতে হবে। অনেক সময় ইঁদুর মাটির নিচের কাসাভা খেয়ে বেশ ক্ষতি করে। এ জন্য বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ ও বিষটোপ ব্যবহার করে ইঁদুর দমন করতে হবে।

    আন্তঃফসল চাষ :

    আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার ৯০ ভাগ কাসাভা জমিতে আন্তঃফসল হিসেবে ডালজাতীয় ফসল ও শাকসবজি চাষ করা হয়। ভারতে কাসাভার সঙ্গে আন্তঃফসল হিসেবে শিম, চীনাবাদাম, মটর, পেঁয়াজ ও শাকসবজি চাষ করা হয়। ইন্দোনেশিয়ায় কাসাভার সঙ্গে ধান ও ভুট্টা চাষ করা হয়। মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডে নারকেল, পাম অয়েল ও রাবার বাগানে আন্তঃফসল হিসেবে কাসাভা চাষ করা হয়। আন্তঃফসল চাষের কারণে কাসাভার ফলনের তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। তবে এ ক্ষেত্রে গাছের ঘনত্ব কিছুটা কমিয়ে দিলে চাষে সুবিধা হয়।

    ফলন :

    সাধারণত হেক্টরপ্রতি ২৫-৩০ টন ফলন পাওয়া যায়। তবে ভালো ব্যবস্থাপনায় উন্নত জাত চাষ করলে হেক্টরপ্রতি ৫৫ থেকে ৬০ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়।

    ব্যক্তিগত উদ্যোগে কুমিল্লার ময়নামতির টিলা অঞ্চল, মধুপুর গড়, গারো পাহাড় ও চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে কাসাভা চাষ করা হচ্ছে। এখানে চাষকৃত জাতগুলো থাইল্যান্ড ও ভারত থেকে আমদানিকৃত এবং একবর্ষজীবী। এসব জায়গায় উৎপাদিত কাসাভা স্টার্চ উৎপাদনের জন্য কারখানায় ব্যবহৃত হয়। গাছপ্রতি ১৫-১৮ কেজি এবং একরপ্রতি ৬ টনের অধিক ফলন পাওয়া যায়। কুমিল্লায় সাথী ফসল হিসেবে কাসাভার সঙ্গে ছড়াকচু এবং মধুপুর অঞ্চলে সরিষা চাষ করা হয়।
    বাংলাদেশের পাহাড়, টিলা, গড় ও শুষ্ক অঞ্চল যেখানে অন্য কোনো ফসল করা যায় না সেখানে কাসাভার চাষ সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। ফসল বহুমুখীকরণ, মঙ্গা মোকাবেলা এবং দেশের পতিত জমিগুলো ফসল চাষের আওতায় নিয়ে আসার জন্য কাসাভা একটি লাগসই ফসল। প্রতি বছর আমাদের দেশের ওষুধশিল্পসহ অন্যান্য শিল্প-কারখানায় প্রচুর পরিমাণে স্টার্চ ও সুক্রোজ প্রয়োজন হয়, যা সাধারণত বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। দেশের পতিত এলাকাগুলো লিজ ভিত্তিতে সহজে কাসাভা চাষের আওতায় নিয়ে এসে স্টার্চের এ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।

    Wednesday, June 14, 2017

    নিরাপদ খাদ্য কি এখনো অনিশ্চিত

  • Share The Gag
  • নিরাপদ খাদ্য কি এখনো অনিশ্চিত



    সেপ্টেম্বর মাসের ২৪ তারিখে একটি দৈনিকের প্রধান খবর ছিল, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এখনো বহুদূরে। এ খবরের মন্তব্যে বলা হয়েছে যে আইন, বিধি প্রণয়নসহ নিরাপদ খাদ্য সংস্থা স্থাপন করা হলেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রধান বাধা হলো ওই সংস্থার জনবলের অপ্রতুলতা।

    স্মরণ করা যেতে পারে যে ২০০০ সালের প্রথমার্ধের আগে এ দেশের খাদ্যনীতিতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার বিষয় খুব অল্প গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০০০ সালের প্রথমার্ধে আবার খাদ্যনীতি প্রণীত হওয়ার সময় নিরাপদ খাদ্য বিষয়টি গুরুত্ব পায়। অতীতের সব খাদ্যনীতিতে সর্বাধিক গুরুত্ব খাদ্যনিরাপত্তাকেই দেওয়া হয়। তবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার বিষয়ে ওই সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাহায্যপুষ্ট একটি কারিগরি সমীক্ষা সম্পাদন করার উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়। দুজন বিদেশি পরামর্শকসহ দুজন বাংলাদেশি পরামর্শকও এ লক্ষ্যে নিয়োগ করা হয়। এ বিষয়ে উদ্যোগী মন্ত্রণালয় ওই সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ছিল। কারণ সরকারি কর্মসম্পাদন বিধির আওতায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ছিল। ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সালে প্রণীত বিধিমালায়ও নিরাপদ খাদ্যসংক্রান্ত বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে ভেজাল খাদ্য ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্পর্কিত খাদ্যের বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধিক্ষেত্রভুক্ত। কিন্তু বাস্তবে ১৯৫৯ সালে নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কিত আইনে খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত করা ছিল। অধিক্ষেত্রভুক্ত এ দ্বৈততা নিয়ে কেউ কোনো সময় মাথা ঘামায়নি।
    স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের স্যানিটারি ইন্সপেক্টররা নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। এ ক্ষেত্রেও দুর্বলতা ছিল প্রচুর। প্রয়োজনীয় জনশক্তির অভাব ছাড়াও অন্যান্য দুর্বলতার বিষয় ছিল উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাবসহ পরীক্ষাগার ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এ দায়িত্ব দিলেও একই ধরনের দুর্বলতা তাদেরও ছিল। এ ছাড়া জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে তারা থানা বা উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালসহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা নিয়ে এত ব্যস্ততা তাদের ছিল যে বাজারে কী ধরনের খাদ্য বিপণন হচ্ছে তা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ওপর ছেড়ে দিয়ে তারা নিশ্চিত ছিল। অন্যদিকে নিরাপদ খাদ্যের বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্ব ছিল। এ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট বা বিএসটিআই। কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল এবং এখনো আছে কীটনাশক অতিমাত্রায় ব্যবহার রোধসহ সার, বীজের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ করা। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনসহ বিপণন প্রক্রিয়ায় অনেক ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। উৎপাদনের ক্ষেত্রে নিম্নমানের কিছু সারের ব্যবহার, তা ছাড়া অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এ কথা অনেকে অনেক সময় বিশেষ করে বলেছেন। এ ছাড়া পানিতে আর্সেনিকের মাত্রাও ঝুঁকিপূর্ণ। আর্সেনিকের মাত্রা সেচের পানিতে বেশি হলে তা খাদ্যশস্যে প্রবেশ করতে পারে। এ নিয়ে অতীতে দেশ-বিদেশে কৃষিবিজ্ঞানীরা অনেক গবেষণা করেছেন। রান্না করা খাদ্যে এ মাত্রা স্বাস্থ্য হানিকর কি না সে বিষয়টি এখন পর্যন্ত পরিষ্কার বা নিশ্চিত নয়। অনেকটা একই যুক্তি বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে। এসব ঝুঁকি বন্ধ করার উপায় হিসেবে আইনের মাধ্যমে জেল-জরিমানার ব্যবস্থা রয়েছে।

    ১৫ বা ২০ বছর আগেও মাছে ও ফলমূলে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারের কথা শোনা যায়নি। জানা যায়, এসব দ্রব্য ব্যবহার করে পচনশীলতা রোধ করা যায়। এ দ্রব্য অর্থাৎ ফরমালিন ব্যবহার বন্ধ করার জন্য মিডিয়া যথেষ্ট খবর প্রকাশ করে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ এ দ্রব্য মাছ বা ফলে রয়েছে কি না তা নির্ণয় করার সহজ পদ্ধতি আবিষ্কার করে। এ পদ্ধতি যে শতভাগ নির্ভুল নয় সে বিষয়টিও প্রচার করা হয়। এসব নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের খুচরা ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, তাঁরা আড়তদারের কাছ থেকে এসব দ্রব্য ক্রয় করেন। তাঁরা কিভাবে জানবেন এতে ফরমালিন মেশানো রয়েছে। অথচ ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁদের জরিমানা করেন। কোনো একপর্যায়ে খুচরা ফল ব্যবসায়ীরা এ নিয়ে এক বা দুদিনের ধর্মঘটও করেছিলেন। এরপর শীর্ষ ব্যবসায়ী সংস্থার উদ্যোগে রাজধানীর বাজারে বাজারে প্রচারসহ সচেতনতা সৃষ্টি করার কাজ করা হয়। কোনো কোনো বাজারকে ফরমালিনমুক্ত বাজার হিসেবে ঘোষণাও দেওয়া হয়। এরপর এ নিয়ে আর কোনো কথা শোনা যায়নি। ধরে নেওয়া হয়েছে এখন আর মাছ বা ফলে ফরমালিন ব্যবহার করা হয় না। সত্যিই কি তাই? অন্যদিকে বিভিন্ন ধরনের ফল বিদেশ থেকেই আমদানি করা হয়। ওই সব দেশের রপ্তানিকারকরা ক্ষতিকর কোনো রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে কি না সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য কারো কাছে নেই। তবে বাস্তবতা হলো, এখন আর এ নিয়ে কেউ কোনো কথা বলেন না। ফরমালিন এখন আর মাছ বা ফলে ব্যবহার হয় না বলে ধরে নিলে বলা যায় যে একমাত্র জেল-জরিমানা করে এসব দ্রব্যের ব্যবহার বন্ধ করা যাবে না। এর জন্য সচেতনতা সৃষ্টিও অপরিহার্য।

    ২০০৬ সালের আগে যেসব খাদ্যনীতি প্রণীত হয় তার মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এরপর খাদ্যনীতিতে নিরাপদ খাদ্যও গুরুত্ব পেয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিত হলো ১৯৯৬ সালে এফএওর উদ্যোগে রোমে যে বিশ্ব খাদ্য সামিট (World Food Summit) অনুষ্ঠিত হয় সে সামিটে খাদ্যনিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নিরাপদ খাদ্যকে গৃহীত সংজ্ঞায় জুড়ে দেওয়া হয়। ওই সময় থেকে এ সংজ্ঞা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সংবাদে জানা যায় যে নিরাপদ খাদ্যসংক্রান্ত বিষয়ে অতীতের অর্থাৎ ১৯৫৯ সালের পিওর ফুড আইন রদ করে নতুন আইন করা হয়েছে। এর আওতায় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সংস্থাও সৃষ্টি করা হয়েছে। আরো জানা যায়, বর্তমানে অন্তত ১৫টি সরকারি সংস্থা নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার কাজে লিপ্ত। নতুন আইনে এখন একক কর্তৃপক্ষ হিসেবে উল্লিখিত সংস্থাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর জন্য নির্দিষ্ট আদালতও সৃষ্টি করার বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে বলা যায় যে অন্যান্য ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আদালত যেমন দ্রুত বিচার আদালত রয়েছে। কিন্তু ফল আশাপ্রদ নয় বলে অনেকেই বলে থাকেন। এ সম্পর্কিত অন্য উদাহরণ হলো শিশু ও নারী নির্যাতন আদালত। আলোচ্য ক্ষেত্রে খাদ্য আদালতের কথা বলা হয়েছে। ১৯৭১ সাল-পূর্ববর্তী সময়ে, বিশেষ করে পঞ্চাশের দশকে এ ধরনের আদালত ছিল। কিন্তু তা ছিল খাদ্য নিয়ে কালোবাজারি বা চোরাকারবারির জন্য। সে অভিজ্ঞতাও ভালো ছিল না। বিশেষ ও নির্দিষ্ট আদালতের অন্য ঝুঁকি হলো ঢালাওভাবে জেলায় জেলায় এ ধরনের আদালত সৃষ্টি করার ইতিহাস। এ অভিজ্ঞতা অন্যান্য ক্ষেত্রে আমাদের রয়েছে। পরে দেখা গেছে বেশির ভাগ জেলায় আদালত মামলাশূন্য বা এত কমসংখ্যক মামলা, যা বিশেষায়িত আদালতের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করে না। অহেতুক ব্যয় বাড়ে। যে বিষয়টি প্রয়োজন তা হলো, প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়, যা এ ধরনের অপরাধ অঙ্কুরেই বিনাশ করতে পারে।

    খাদ্যে ভেজালসংক্রান্ত অপরাধ করার প্রমাণের জন্য যেকোনো আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য যুক্তি উপস্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। এ ধরনের প্রমাণের অন্যতম উৎস নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাগার। প্রকাশিত খবরে জানা যায় যে বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরীক্ষাগার মহাখালীতে জনস্বাস্থ্য সংস্থায় কাজ শুরু করেছে। এ পর্যন্ত এ পরীক্ষাগারে অন্তত ১৫টি পণ্যে স্বাস্থ্যহানিকর দ্রব্যের অস্তিত্ব নির্ণয় করা হয়েছে। এর অধিকাংশেই অতিমাত্রায় ক্ষতিকারক কীটনাশক রয়েছে। কিন্তু এরপর কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে তা এখনো জানা যায়নি। বিষয়টি এখানেই থেমে থাকলে কোনো ফল হবে না। নবসৃষ্ট এ কর্তৃপক্ষের অন্য বাধা হলো আইনটি প্রয়োগ করার জন্য কমপক্ষে সাতটি বিধি প্রণয়ন করতে হবে, যা এখনো করা যায়নি। বিধি ও জনবল না হলে আইনটি প্রয়োগ করা সম্ভব হবে না।

    Sunday, June 11, 2017

    নিরাপদ খাদ্য কি

  • Share The Gag
  • নিরাপদ খাদ্য আধুনিক জীবনে শিল্পজাত খাদ্য একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। এ খাদ্যকে স্বাভাবিক এবং ভেজাল ও অন্যান্য দূষণ থেকে নিরাপদ অবস্থায় বিতরণ এখন একটি বিশ্ব সমস্যা। অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি ছাড়াও নানা কারণে খাদ্য দূষিত হতে পারে। খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহণ, খাদ্যগ্রহণ প্রক্রিয়ার যে কোন পর্যায়ে শিল্পায়িত খাদ্য খাদ্যের অনুপযোগী হয়ে যেতে পারে। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার দ্বার পর্যন্ত খাদ্যের গুণগত মান নিশ্চিত রাখা একটি বড় সরকারি ও বেসরকারি দায়িত্ব।

    খাদ্যশিল্পের দায়িত্ব উৎপাদিত খাদ্যসামগ্রী স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানসমূহ এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য আধুনিক মান নির্ধারণ ব্যবস্থাপনা করতে আইনগতভাবে বাধ্য। এ সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনার প্রধান তিনটি পদ্ধতি হলো:

    উত্তম উৎপাদন পদ্ধতি (Good Manufacturing Practice or GMP)-এর আওতায় ঐ সমস্ত পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে যার ফলে খাদ্যের সঙ্গতিপূর্ণ মানসহ নিরাপদের বিষয়টি নিশ্চিত করার প্রমাণ রয়েছে।

    প্রক্রিয়াজাতজনিত সংকট নির্ধারণ এবং এর প্রতিটি ধাপের নিয়ন্ত্রণ (Hazard Analysis Critical Control Points সংক্ষেপে HACCP)। খাদ্যের মান ও এর নিরাপদ হওয়ার বিষয়টি সনাতনী পদ্ধতির দৃষ্টিকোণ প্রক্রিয়াকৃত খাদ্যের মধ্যেই সীমিত ছিল। HACCP সাম্প্রতিককালে উদ্ভাবিত একটি সক্রিয় কারিগরি পদ্ধতি। এ পদ্ধতি প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রতিটি পর্যায়ে সম্ভাব্য সমস্যা ও তা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।

    মান নিশ্চয়তার বিধান আর্ন্তজাতিক মান নির্ধারণ সংস্থা (International Standards Organization ISO 9000) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত মানের (EU 29000) মাধ্যমে খাদ্য শিল্পের সাথে জড়িত প্রতিষ্ঠানসমূহ এই দুটি সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকে বা করা যায়। এ ধরনের কর্মসূচির কার্যকারিতা নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ দ্বারা নিয়মিতভাবে মূল্যায়িত হয়।

    যে সমস্ত খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠান এ ধরনের মান ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণ করে তারা এ প্রক্রিয়ায় সরবরাহকারী সূত্র (যেমন কৃষক এবং পাইকারি কাঁচামাল সরবরাহকারি সংস্থা), পরিবহণ সংস্থা, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদেরও জড়িত করে। খাদ্য উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত উৎপাদিত খাদ্য বাজারজাত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের মোড়ক ও আধার ব্যবহূত হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে উৎপাদিত ও প্রক্রিয়াকৃত খাদ্যসামগ্রী উত্তম অবস্থায় ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে। পরিবহণ, পাইকারি গুদাম, খুচরা বিক্রয়স্থল এবং বসতবাড়ি পর্যন্ত এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খাদ্যের মান ও নিরাপদ হওয়ার বিয়ষটি নিশ্চিত হয়ে থাকে। মোড়ক বা আধারের সাথে যুক্ত লেবেলে খাদ্য সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি ছাড়াও এর ফলে খাদ্য সংরক্ষণ সহজতর হয়। অন্যদিকে সাধারণত মোড়ককৃত বা টিনজাত খাদ্যের উৎপাদনের তারিখসহ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নাম ঠিকানাও দেওয়া হয়। ফলে, এ সংক্রান্ত কোন অভিযোগের বিষয় প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহণ ও খুচরা বিক্রেতারা মালামাল সংক্রান্ত সম্ভাব্য সঙ্কটও সমাধান করতে সক্ষম হয়।

    ফসল কাটা থেকে খাদ্য গ্রহণ করার যে কোন স্তরে রাসায়নিক দ্রব্যাদি এবং জীবাণু দ্বারা বিষাক্ত বা দূষিত হতে পারে। সাধারণত নিরাপদ খাদ্যের ঝূঁকি দুই ধরনের:

    ক.   জীবাণু সংক্রান্ত দূষণ (যথা বিভিন্ন ধরনের জীবাণু, ছত্রাক ইত্যাদি)। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ কারণে দূষিত খাদ্য মানবদেহে বিভিন্ন বিরূপ উৎসর্গের সৃষ্টি করে।

    খ.    রাসায়নিক দ্রব্যাদি দ্বারা দূষণ। এর মধ্যে রয়েছে পরিবেশ দূষণ সংক্রান্ত দ্রব্যাদি, পশুর ঔষধের অবশিষ্টাংশ, ভারি ধাতু অথবা অন্যান্য অবশিষ্টাংশ যা কারো অগোচরে খাদ্যে অনুপ্রবেশ করে।

    কোন দূষণ সৃষ্টিকারী দ্রব্য স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিপদ ডেকে নিয়ে আসবে কিনা তা অনেকগুলি কারণের উপর নির্ভরশীল। দূষণ সক্ষম বস্ত্তর বিষ এবং এর গ্রহণ ছাড়াও দূষিত খাদ্যে বিষের মাত্রা ও পরিমাণ এবং সময়কালসহ অন্যান্য কারণ। বিষের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া রোধ করার ক্ষমতাও ব্যক্তিভেদে ভিন্নতর হয়। এ ছাড়া রয়েছে আরেকটি জটিল কারণ। পশু সংক্রান্ত গবেষণালব্ধ তথ্যাদি মানবদেহে যে একই ধরনের ক্ষতি করবে তার অনিশ্চয়তা।

    নিরাপদ খাদ্য ক্রমবর্ধমানভাবে জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। বিশ্বব্যাপী সব সরকারই নিজ নিজ ক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য বহুবিধ প্রচেষ্টার গতি তীব্র করছে। এর কারণ হচ্ছে নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক সমস্যার বৃদ্ধিসহ ভোক্তাদের আশঙ্কা। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে দূষিত খাদ্যজনিত রোগ বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের ক্রমবর্ধমান সমস্যা হিসাবে চিহ্নিত।

    দূষিত খাদ্যগ্রহণের জন্য রোগের মাত্রার গভীরতা ও ব্যাপকতা নির্ণয় করা কঠিন। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে, ২০০৫ সালেই উদরাময় রোগে বিশ্বের ১.৮ মিলিয়ন মানুষ মূত্যুবরণ করেছে। দূষিত খাদ্যগ্রহণ ও পানি পান করা এ ধরনের মূত্যুর সিংহভাগ হবে। এছাড়া, শিশুদের অপুষ্টির একটি প্রধান কারণ উদারাময় রোগ।

    শিল্পোন্নত দেশে খাদ্যবাহিত রোগের সংখ্যা প্রতিবছর শতকরা ৩০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে মর্মে তথ্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর প্রায় ৭৬ মিলিয়ন মানুষ দূষিত খাদ্যের ফলে রোগে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা যায়। ফলে ৩ লাখ ২৫ হাজার রোগী হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গিয়েছে। প্রতিবছর এ ধরনের রোগীর মূত্যুর সংখ্যা হবে ৫ হাজার। অনুন্নত দেশসমূহে এ সংক্রান্ত তথ্যের দূর্বলতা রয়েছে। তবে একথা অনস্বীকার্য যে, এ সমস্ত দেশেই দূষিত খাদ্যজনিত রোগের প্রকোপ ও ব্যাপকতা অধিকতর। বহু অনুন্নত দেশে উদারাময় রোগের প্রকোপ এর প্রমাণ বহন করে।

    অধিকাংশ দেশে দূষিত খাদ্যজনিত রোগের ঘটনা এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগের তথ্য পাওয়া দুস্কর। তবে এ কথা ঠিক যে এ ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব মহামারীর আকার ধারণ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় যে, ১৯৯৪ সালে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেই salmonellosis জীবানু বহনকারী আইসক্রিম খাওয়ার ফলে ২,২৪,০০০ ব্যক্তি রোগে আক্রান্ত হয়। ১৯৮৮ সালে দূষিত শামুক বা গলদা চিংড়ি খেয়ে চীনে প্রায় ৩ লাখ মানুষ রোগাক্রান্ত হয়।

    ২০০৮ সালে চীনে প্রস্তুতকৃত কয়েকটি সংস্থার দূষিত গুড়াদুধ পান করে বহু শিশু রোগাক্রান্ত হয়। কারণ, ঐ ধরনের শিশুখাদ্যে মেলামাইনের মাত্রা বেশি ছিল। বাংলাদেশও এ দুধ আমদানির মাধ্যমে আসে। সম্ভাব্য বিপদ এড়ানোর জন্য সরকার ঐ দুধসহ উন্নত দেশের কয়েকটি দুধ আমদানি নিষিদ্ধ করে দেয়। এর ফলে আমদানিকারকরা হাইকোর্টে মামলা করলে আদালতের নির্দেশে সবকয়টি ব্রান্ডের নিষিদ্ধ দুধ বিদেশে আর্ন্তজাতিক মানসম্পন্ন ল্যাবোরটরিতে পরীক্ষার পর আমদানির জন্য কয়েকটি ব্যান্ডকে ছাড়পত্র প্রদান করে।

    অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সাথে অংশিদারত্বের ভিত্তিতে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (WHO) নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক নীতি প্রনয়ণের কাজে লিপ্ত। বিভিন্নমূখী পারদর্শীতা ব্যবহার করে এ সংক্রান্ত খাদ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিস্তরে ব্যাপৃত হবে। এ সংস্থার খাদ্য অধিদপ্তর নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করাসহ উত্তম খাদ্য প্রস্ত্তত প্রণালি, খুচরা বিক্রেতা ও ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করবে। ভোক্তার প্রশিক্ষণ এবং খাদ্য ব্যবস্থাপনা দূষিত খাদ্যজনিত রোগ প্রতিরোধ করার অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে একটি উত্তম উপায়।

    বিশ্ব খাদ্য সংস্থা মানুষ ও পশুর মধ্যে দূষিত খাদ্য বহনকারী রোগ প্রতিরোধের জন্য সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাগারে নজরদারি খাদ্যদূষণে সক্ষম বস্ত্তর নিবিড় পরীবিক্ষণ ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করার প্রয়াস নিয়েছে। এ লক্ষ্যে সদস্য দেশসমূহের সহযোগিতা এ সংস্থার কাম্য। উদ্দেশ্য হচ্ছে আর্ন্তজাতিকভাবে স্বীকৃত নিদের্শনার মাধ্যমে এ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা। এ সংস্থা অংশগ্রহণকারী সংশ্লিষ্ট সংস্থার সংখ্যাবৃদ্ধিসহ সহায়তা নিয়ে বিশ্বব্যাপি একটি নেটওয়ার্ক স্থাপন করবে, বিশেষ করে অনুন্নত দেশসমূহে। নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক জনস্বাস্থ্যের অবদান রাখার জন্য এ সংস্থা খাদ্য সংক্রান্ত কারিগরি ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করছে। এ সংক্রান্ত বিষয়ে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা একটি নতুন উদ্যোগও গ্রহণ করেছে। ফলে নিরাপদ খাদ্য সংক্রান্ত কার্যাবলীর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি স্থাপন করা হবে। এ লক্ষ্যে এ সংস্থাও বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সমন্বয়ে দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে একটি পরামর্শক বোর্ড গঠিত হয়েছে। খাদ্যে জীবানু সংক্রান্ত দূষণের মাত্রা নির্ণয় হবে এ ব্যবস্থাপনা কাঠামোর একটি মূল বিষয়।

    বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা Codex Alimentarius Commission-এর নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক মান, নির্দেশনা ও সুপারিশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত। এর উন্নতিকল্প বিশ্ব খাদ্য সংস্থা এ কাজে তাদের অংশগ্রহণের মাত্রা আরও নিবিড় করেছে।

    বর্তমানে বায়োটেকনোলজি বিশ্বের উন্নত ও অনুন্নত দেশসমূহের জন্য একটি প্রধান বিষয় হিসাবে গণ্য। এ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য ও এহেন খাদ্যে পুষ্টির গুণাগুণের বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করার সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে। এ প্রযুক্তিপ্রসূত খাদ্যের ঝুঁকি, উপকারিতা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একটি জ্ঞানসম্পন্ন ভিত্তি স্থাপন করাই মূল উদ্দেশ্য।

    বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য সংক্রান্ত আইন ও বিধি  বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ-১৯৫৯ এবং বিশুদ্ধ খাদ্য বিধিমালা-১৯৫৭; পশুজবাই (বিধিনিষেধ) এবং মাংস নিয়ন্ত্রণ (সংশোধনী) অধ্যাদেশ-১৯৮৩; বিএসটিআই অধ্যাদেশ-১৯৮৫ (সংশোধনী আইন, ২০০৩); ধ্বংসকারী পোকামাকড় বিধি (প্লান্ট কোয়ারেনটাইন)-১৯৬৬ (১৯৮৪ পর্যন্ত সংশোধিত); কৃষিপণ্য বাজার আইন-১৯৬৪ (সংশোধিত ১৯৮৫); মৎস সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন-১৯৫০ (সর্বশেষ সংশোধনী ১৯৮৫); সামুদ্রিক মৎস্য অধ্যাদেশ-১৯৮৩ এবং বিধি-১৯৮৩; মৎস্য ও মৎসজাত পণ্য (পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ) বিধি-১৯৯৭; জরুরি পণ্য আইন-১৯৫৭, ১৯৫৮ ও ১৯৬৪; খাদ্য বা বিশেষ আদালত আইন-১৯৫৬; খাদ্যশস্য সরবরাহ (ক্ষতিকর কার্যাবলী নিরোধ) অধ্যাদেশ-১৯৫৬; পোকামাকড় ধ্বংসকারী ঔষধ অধ্যাদেশ-১৯৭১ এবং এ সংক্রান্ত বিধি-১৯৮৫।

    নীতি যোগাযোগ (Policy Linkages) খামার থেকে টেবিল পর্যন্ত ব্যাপৃত নিরাপদ খাদ্যের গুরুত্ব সরকারি সংশ্লিষ্ট সকল নীতিতে যথাযোগ্য গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ নীতিগুলি হচ্ছে: বাংলাদেশ পরিবেশ নীতি-১৯৯৮; বাংলাদেশ খাদ্য ও পুষ্টি নীতি-১৯৯৭; এবং জাতীয় পুষ্টি নীতি-১৯৯৭; বাংলাদেশ খাদ্য নীতি-১৯৯৮; ব্যাপক খাদ্য নিরাপত্তা নীতি-২০০১ এবং নতুন জাতীয় খাদ্য নীতি-২০০৬; জাতীয় কৃষি নীতি-১৯৯৯, বাংলাদেশ স্বাস্থ্য নীতি-২০০১; এবং রপ্তানি নীতি ইত্যাদি। এ ধরনের গুরুত্ব দেওয়া সত্ত্বেও নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক আইনে যথা বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ-১৯৫৯ এবং এর আওতায় বিধিতে Codex Alimentarius-এ বিধৃত মান, নির্দেশনা এবং ব্যবহারিক পদ্ধতিকে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করা হয় নি। এর মধ্যে HACCP রয়েছে। কিন্তু মৎস ও মৎসজাত পণ্য (পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ১৯৮৩) এবং বিধিতে HACCP-এর নীতিসমূহের স্বীকৃতি রয়েছে। বিএসটিআইও HACCP-এর মান গ্রহণ করেছে।

    ২০০৮ সালে বাংলাদেশ সরকার নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। দুটি উন্নয়ন সহযোগীর অর্থ সহায়তা এ প্রকল্প ও স্বাস্থ্য এবং পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এটি বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্প সমাপ্তির পর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করণসহ খাদ্য পরীক্ষাগারসমূহের উন্নতি হবে বলে আশা করা যায়।

    খাদ্যের মান  বিশুদ্ধ খাদ্য বিধি (১৯৬৭) এর আওতায় সর্বমোট ১০৭ খাদ্যসামগ্রীকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

    বিএসটিআই ১৯০টি খাদ্যের মান নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে ৫২টির জন্য ছাড়পত্র গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। ২৮টি Codex মান স্বীকৃতি পেয়েছে।  [এ.এম.এম শওকত আলী]